তাজউদ্দীন আহমদের কাছে ঋণ

1080

Published on জুলাই 23, 2019
  • Details Image

শুভ কিবরিয়াঃ 

তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫) তখনো কলেজ স্টুডেন্ট। তার পরের বছর তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করছেন। কিন্তু পুরোদস্তুর রাজনীতিতে নিমগ্ন। ঢাকায় মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের মূল চক্রের একজন তখন তিনি। আবার নিজ এলাকা কাপাসিয়ায় পূর্ণোদ্যমে যুক্ত সামাজিক কাজে। ঢাকা-কাপাসিয়া নিত্য যাতায়াত। এরকম এক দিন ৩ নভেম্বর ১৯৪৭, সোমবার। এই বছরের আগস্টেই ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়েছে। জন্ম নিয়েছে দুই নতুন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান।

দিন বারো আগে ঢাকা থেকে কাপাসিয়া এসেছেন ২২ বছর বয়সী তরুণ তাজউদ্দীন আহমদ। এদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত পড়াশোনা করে নদীতে মাছ ধরতে গেছেন। দুপুরে ঘরে ফিরে বিকাল সাড়ে ৩টায় রওনা হয়েছেন নিজ গ্রাম দরদরিয়া থেকে পাশের গ্রাম গোসিঙ্গাতে এক জনসভায় যোগ দিতে। আসর নামাজের পর বিকাল সাড়ে ৫টায় জনসভা শুরু হয়। প্রায় ৩০০ লোক উপস্থিত। সেই জনসভায় বক্তা হিসেবে উপস্থিত সিলেটের হাজিমউদ্দীন, বড়াদির মৌলভি হাবিবুর রহমান। স্থানীয় কাচারির সামনে সভা। বক্তা হিসেবে গোসিঙ্গার নায়েবও অংশ নিয়েছেন।

এই দিনের কথা ডায়েরিতে লিখেছেন তরুণ তাজউদ্দীন, ‘প্রথমে আমি প্রায় একঘণ্টা ধরে বক্তৃতা দিলাম। তারপর মাগরিব পর্যন্ত সিলেটের হাজিমউদ্দীন এবং মাগরিবের পর বড়াদির মৌলভি হাবিবুর রহমান ভাষণ দিলেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে সবাই সমস্বরে আমাকে আবার বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ধরল। আমি আবার রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত বক্তৃতা করলাম। তারপর সভা শেষ হলো।’

জনতার অনুরোধের কথা ডায়েরিতে লিখেছেন তাজউদ্দীন আহমদ। ইংরেজিতেই ডায়েরি লিখতেন। লিখেছেন, at about 7 pm people in one voice requested me to speak again-I again spoke upto 9.30 pm.

এই আড়াই ঘণ্টা কী বিষয়ে বললেন তরুণ তাজউদ্দীন আহমদ! ১৯৪৭ সালের ওই ঘোর মফস্বলে শীতের রাতে গ্রামের আমজনতাই বা কী কথা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলেন? তার বয়ানও আছে তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি পর্যায়ক্রমে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে কথা বললাম। আমাদের একটা জনগণের রাষ্ট্র গঠন করা উচিত। দুর্নীতি ও ঘুষ শক্ত হাতে বন্ধ করতে হবে। মানুষ খোলামনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবকিছু দেখতে এবং বুঝতে শিখুক। একটা সুখী রাষ্ট্র গঠনে সহযোগিতা করার জন্য সবাইকে আবেদন জানালাম। দেশের কাজে হিন্দুদেরও এগিয়ে আসতে হবে এবং তাদের ভাবা উচিত যে, পাকিস্তান তাদের নিজেদেরই দেশ। অফিসার, মাধ্যমিক শিক্ষক, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ৫০ টাকা ও পাট শ্রমিকদের বেতন ৪০ টাকা হওয়া উচিত এই কথাও বললাম।’

১৯৪৭ সালের সেই শীতের রাতে কি বোঝা গিয়েছিল এই তরুণ রাজনীতি ও সমাজকর্মী দেশের এক ক্রান্তিলগ্নে, জাতির জন্মযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হবেন? আর তার মেধা, সততা, নীতিনিষ্ঠতা, একাগ্রতা, জনগণের কল্যাণ কামনার উদগ্র আকাক্সক্ষা দিয়ে এক স্বাধীন দেশের গোড়াপত্তনে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখবেন?

দুই.
আমাদের রাজনীতিতে এরপর অনেক উথালপাতাল ঘটনা ঘটেছে। অনেক মৃত্যু ও রক্তপাত ঘটেছে। রাষ্ট্র যে আকাক্সক্ষা নিয়ে জন্ম নিয়েছিল তার অনেক কিছুই অপূর্ণ থেকেছে। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ তার নীতি থেকে টলেননি। তার স্টেটসম্যান সুলভ কর্মকা- আমৃত্যু বহাল রেখেছেন। স্বাধীন দেশে তখন তিনি অর্থমন্ত্রী। সেই সময়ে তার একান্ত সচিব আবু সাঈদ চৌধুরীর বরাতে একটি ঘটনার কথা জানা যায়। গল্পটা পুরনো। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদের নীতিনিষ্ঠতা বোঝার জন্য গল্পটা খুব প্রয়োজনীয়ও বটে।

তাজউদ্দীন আহমদের একান্ত সচিব বলছেন, ‘তাজউদ্দীন সাহেব সাধারণত আমাকে তার বাসায় যেতে বলতেন না। খুব বিশেষ কোনো কাজ থাকলে যেতে বলতেন। এ ছাড়া আমি যদি যেতাম সেটা আমার ইচ্ছা। সেই সময় রোববারে ছুটি থাকত। এক শনিবারে আমরা কাজ সেরে রাত ১০টার পর যখন সচিবালয় থেকে ফিরছি সেই মুহূর্তে তাজউদ্দীন সাহেব বললেন, ‘চৌধুরী সাহেব, কাল আমরা কিছু অফিসিয়াল কাজ করব। আমি পিএ-কে বলে দিয়েছি ফাইলগুলো বেঁধে গাড়িতে দিতে।’

আমি আপত্তি জানিয়ে বললাম, ‘স্যার, পুরো সপ্তাহ ধরে রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত কাজ করছি। আগামীকাল ছুটির দিন, স্যার, আমার তো একটা সংসার আছে।’ তিনি বললেন, ‘চৌধুরী সাহেব, কালকের দিনটা একটু কষ্ট করতে হবে, কারণ কাল আমি কিছু জরুরি ফাইল ছাড়ব। আপনি তো জানেন ফাইলগুলো আমার টেবিলে আছে।’

পরদিন সকালে আমি তার হেয়ার রোডের বাসায় গেলাম। আমি যাওয়ার আগেই তিনি দোতলার বারান্দায় বসে ফাইল দেখা শুরু করেছেন। আমি তার পাশে রাখা চেয়ারে বসলাম। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে একটি ফাইলে লিখছিলেন। প্রায় দুই পৃষ্ঠার মতো লিখে সেটা একবার পড়ে সই করে ‘লিলি, লিলি’ (বেগম জোহরা তাজউদ্দীন) বলে ডাকতে লাগলেন। বেগম তাজউদ্দীন রুম থেকে বের হয়ে আসতেই তিনি বললেন, ‘ওই প্রমোশন কেসটা আমি অনুমোদন দিয়ে দিলাম।’

বেগম তাজউদ্দীন বললেন, ‘তুমি বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী, তুমি তোমার মন্ত্রণালয়ের কাকে প্রমোশন দেবে না দেবে সেটা তোমার ব্যাপার, এর মধ্যে আমার তো বলবার কিছু নেই।’ তাজউদ্দীন সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, ‘লিলি, তুমি ঠিকই বলেছ, কিন্তু এই কেসটার সঙ্গে তোমার একটা সম্পর্ক আছে, তাই তোমাকে জানিয়ে রাখলাম।’ আমি তাজউদ্দীন সাহেবের কথা শুনে ভাবছিলাম ব্যাপারটা কী। ঠিক ওই সময় মুখে প্রশান্তির হাসি নিয়ে তিনি আমার দিকে সেই ফাইলটা এগিয়ে দিলেন।

আমি আগাগোড়া ফাইলটি পড়লাম। একজন কর কর্মকর্তার পদোন্নতির ফাইল। নিচ থেকে নোটিং হয়ে উপরে এসেছে এবং পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তবে লেখা হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধে তার বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়টি বিবেচ্য। তাজউদ্দীন সাহেব রেফারেন্স দিয়ে দিয়ে লিখেছেন এবং যার সারমর্ম হচ্ছে : আমি তার এসিআরগুলো দেখলাম। চাকরি জীবনের রেকর্ড অনুযায়ী তার পদোন্নতি পাওয়া উচিত। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বিতর্কিত ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। কারও প্রতি সন্দেহবশত কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে বলে আমি মনে করি না। যদি তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকে তবে তা আলাদাভাবে উত্থাপন করা যেতে পারে। যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ এখানে দেখানো হয়নি বা কোনো প্রমাণও নেই, তাই আমি বিষয়টিকে বিবেচনার মধ্যে না এনে তার এই পদোন্নতি অনুমোদন করলাম। পড়া শেষ করে বললাম, ‘স্যার, এখনো বুঝিনি ব্যাপারটা যে কী, আর ভাবীকেই বা আপনি ওই কথা বললেন কেন!’

এবার তাজউদ্দীন সাহেব বললেন, ‘২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ শুরুর মুহূর্ত কয়েক আগে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু লিলি যেতে পারেনি, ভাড়াটে সেজে কপালগুণে আর্মির হাত থেকে ছোট দুটো বাচ্চাসহ রক্ষা পায়। তারপর একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ঘুরতে ঘুরতে ধানমন্ডি ১৩ নম্বর রোডের লেকের পাশে পরিচিত এক ভদ্রলোকের বাড়িতে গিয়ে ওঠে পাঁচ বছরের মিমি আর এক বছরের সোহেলকে নিয়ে। সে সময় ভদ্রলোক বাসায় ছিলেন না। ফিরে এসে লিলির উপস্থিতি পছন্দ করলেন না। রাতে কারফিউয়ের মধ্যেই সেই ভদ্রলোক বললেন, আমার বাড়িটা তো একদম বড় রাস্তার পাশে, যদি আর্মি এখানে এসে পড়ে তবে সবার অসুবিধা হবে। তাই আপনি আমার সঙ্গে আসুন, আমি আপনাকে দুটো বাড়ি পরে রেখে আসি। লিলি সেই রাতে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ভদ্রলোকের সঙ্গে বের হলো। বাসার গেটের বাইরে গিয়ে তিনি বললেন, আপনি একটু দাঁড়ান, আমি একটা জরুরি জিনিস নাকি চাবি ফেলে এসেছি, এক মিনিটে নিয়ে আসছি। ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকে কাঠের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে লিলি আবার ভেতরে ঢুকে দরজায় কড়া নাড়ল, বেল বাজাল, কিন্তু ভেতর থেকে কেউ আর দরজা খুলল না। তখন আর কোনো উপায় না দেখে লিলি সমস্ত রাত রাস্তার ওপর বাড়ি তৈরির জন্য স্তূপ করে রাখা ইটের পাশে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে বড় রাস্তায় আর্মির আনাগোনা আর কারফিউয়ের মধ্যে বসে রইল।

‘এবার শুনুন, সেই ভদ্রলোকটিই এই লোক। আমি যার পদোন্নতির কেস অনুমোদন করলাম। আমি মনে করি আমাদের জীবনের এই ঘটনার সঙ্গে তার চাকরিজীবনকে এক করে দেখা উচিত নয়। কেউ হয়তো কোনোভাবে জেনেছে আমার পরিবারের সঙ্গে তার এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল, তাই তার ফাইলে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার কথা।’

তাজউদ্দীন সাহেবের কথা শেষ হলে আমি থমকে গেলাম। বিস্মিত হয়ে শুধু বললাম, ‘স্যার, ইউ আর অ্যা গ্রেটম্যান!’ তারপর আমরা আবার অন্যান্য ফাইলগুলো দেখতে শুরু করলাম।

তিন.
১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই ঢাকা জেলার কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামে জন্মেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। আজ ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই যখন আমরা তার ৯৪তম জন্মবার্ষিকী পালন করছি তখন ভাবছি, বাঙালি জাতির স্বভাব, সম্ভাবনা আর স্বপ্নকে কতটা সুনিশ্চিতভাবেই জেনেছিলেন জাতির ক্রান্তিকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই রাজনীতিবিদ। ১৯৭৪ সালের ২০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলের সমাপনী অধিবেশনে একটা অসাধারণ বক্তৃতা করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

সে সময় তার অনেক কথা খোদ সরকার বা দলের লোকেরও পছন্দ হয়নি। সারা দেশ থেকে আসা দলীয় নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে সেই বক্তৃতায় তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘সবাই বলে চোর, চোর, চোর। তবে চুরি করে কে, কে তারা? আমি তো এই পর্যন্ত শুনলাম না বিগত দুবছরে, কোনো কর্মী এসে বলেছে যে, আমার চাচা ওই রিলিফের চাল চুরি করেছে। এমন তো কেউ বলেনি। বরং পল্টন ময়দানে বক্তৃতা করে দাবি করেন, দুর্নীতি ধরে ফেলতে হবে, আর দুর্নীতির অভিযোগে কেউ ধরা পড়লে বাড়িতে এসে বলেন তাজউদ্দীন ভাই আমার খালু ধরা পড়েছে, উনাকে ছেড়ে দেন। আমি বলি যে, আপনি না বক্তৃতা করে এলেন? উত্তর দেন বক্তৃতা করেছি সংগঠনের জন্য, আমার খালুরে বাঁচান। এই হলো বাংলাদেশের অবস্থা। কোথায় সামাজিক বয়কট? দুর্নীতি যারা করে তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কট করতে হবে।’

চার.
খুব স্বল্প পরিসরে এই ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। রাজনীতি আর রাষ্ট্র যে দুটো পৃথক জিনিস-এই শিক্ষাটা তিনিই প্রথম দেন আমাদের। রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে দিতে চাইলে রাজনীতিকেও কিছু নীতি ও নৈতিকতার মধ্য দিয়ে চলতে হয়। সরকার, রাজনৈতিক দল আর রাষ্ট্র একাকার হয়ে গেলে গুটিকতকের পেট হয়তো ভরে কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসাবে রাষ্ট্র ফাঁপা হয়ে উঠতে থাকে। রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে দিতে চাইলে যে রাজনীতিবিদদেরও অনেক নিষ্ঠা, লোভহীনতা আর সিস্টেমের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনির্মাণকে মেনেই এগুতে হয়-এই শিক্ষাটা কর্ম ও ভাবনার মারফত তাজউদ্দীন আহমদের মতো করে খুব কম মানুষই আমাদের দিয়েছেন। তার কাছে তাই আমাদের ঋণ অপরিসীম।

লেখকঃ নির্বাহী সম্পাদক সাপ্তাহিক এবং তাজউদ্দীন আহমদ পাঠচক্র পরিচালনা পরিষদের সদস্য

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত