খালেদার জেল ও বাংলাদেশের রাজনীতির আরেক অধ্যায়ঃ স্বদেশ রায়

7604

Published on ফেব্রুয়ারি 11, 2018
  • Details Image

খালেদা জিয়াই প্রথম বাংলাদেশের কোনও সাবেক নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধান যিনি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে জেলে গেলেন। খালেদা জিয়াকে যদি শুধু সাবেক নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলনা করতে হয়, তাহলে তাকে তুলনা করতে হবে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমদ, মনসুর আলীর সঙ্গে।

তবে রাজনৈতিক গতিপথে খালেদা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। উল্লিখিত তিনজন শুধু এ দেশের স্রষ্টা নন, তাদের রাজনীতি ছিলো সকল রকম কালিমার উর্ধে্ব। অন্যদিকে খালেদার রাজনীতি উল্লিখিত তিনজনসহ ১৯৭৫ এর হত্যাকারীদের পক্ষের রাজনীতি। দুর্নীতি ও মানুষ হত্যার এক কালো আঁধারের এক রাজনীতি।

হত্যাকারীদের পক্ষের রাজনীতির একজন হয়ে খালেদা কেন এদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হলেন? বাংলাদেশের মানুষ কেন তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলো- এটা একটি বড় প্রশ্ন হতে পারে। বাস্তবে এটা ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্টের প্রতিবিপ্লবের ফল।

পৃথিবীর বহুদেশে বিপ্লবের পরে প্রতিবিপ্লবীরা এসে দীর্ঘকাল শুধু দেশ শাসন করেনি তারা এক ধরনের জনসমর্থনও অর্জন করেছে। তারা একটি সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণীও সমাজে গড়ে তোলে- যাদের ওপর নির্ভর করে তারা সমাজে এক ধরনের মর্যাদাও অর্জন করে।

শুধু তাই নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের মর্যাদাবান ক্ষেত্রগুলোতে তারা তাদের প্রতিনিধি গড়ে তোলে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ১৯৭৫ এর প্রতিবিপ্লবের একজন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদেরও একজন। তারপরেও তার সৃষ্ট রাজনৈতিক দল বিএনপি শুধু নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যায়নি; তারা সমাজের নানান ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানকে গড়ে তুলেছে। এমনকি বর্তমানেও একটি বিভ্রান্ত তরুণ প্রজম্ম তাদের সঙ্গে। শুধু এ নয়, জিয়াউর রহমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়াতে এই দলটির গায়ে একটি মুক্তিযুদ্ধের মোড়কও আছে। তবে জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও খালেদা তিনজনই ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিকে এদেশে শুধু প্রতিষ্ঠিত করেননি, দেশকে আরেকটি পাকিস্তান বানানোর সব চেষ্টা করেছেন।

পাকিস্তান আজ শুধু একটি রাষ্ট্রের নাম নয়, একটি প্রতীকি শব্দ। পাকিস্তান অর্থই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র শুধু নয় সেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মূলত ‘ক্লেপ্টক্রেসী’ চালু করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের টাকা চুরি করে ব্যক্তির অর্থে পরিণত করা হয়। আর সাধারণত এই অর্থ পৃথিবীর বড় বড় আন্ডার গ্রাউন্ড ব্যবসা যেমন, অস্ত্র চোরাচালানি, মাদক চোরাচালানী, মানব পাচার ইত্যাদিতে ব্যবহার করে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা হয়। সেই সম্পদ রক্ষা ও ব্যবসা চালানোর জন্যে দেশের ভেতর ও বাইরে জঙ্গী সংগঠনও গড়ে তোলা হয়। বাংলাদেশে এটা দৃশ্যমান হয় খালেদা জিয়ার আমলে। তারেক রহমানকে মূল নায়ক করে এই কাজ করা হয়। খালেদা যেমন স্বাধীনতা বিরোধীদের আশ্রয়দাতা তেমনি এদেরও আশ্রয়দাতা।

তারেক ও খালেদার এই রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সম্পদ লুট করার পক্ষে তারা দেশের ভেতর সব থেকে বড় শক্তি গড়ে তোলে জামায়াতে ইসলামীকে প্রতিষ্ঠিত হবার সব সুযোগ দিয়ে এবং অনান্য তথাকথিত ধর্মীয় মৌলবাদী গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে। যাতে করে তাদের গায়ে কেউ হাত দিতে গেলে ধর্মীয় মৌলবাদী গ্রুপ নেমে আসে। যে কারণে দেখা যায়, কোনওরূপ ধর্মীয় আচরণ পালন না করেও খালেদা জিয়া বাংলাদেশের তথাকথিত ধর্মীয় মৌলবাদী গ্রুপের মূল নেতা। এর মূল কারণ ধর্ম নয় ওই অবৈধ অর্থ।

শেখ হাসিনা ১৯৯৬তে একবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছিলেন। তবে ২০০৯ এ যে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন এই দুই শেখ হাসিনার ভেতর সাগরসম পার্থক্য। কারণ, ২০০৯ এ যে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছেন তিনি শুধু একজন পরিপক্ক রাষ্ট্র নায়ক নন, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি যে প্রতিবিপ্লবের চক্রে আটকা পড়ে গেছে সেখান থেকে বের করে আনার মত এক শক্তিশালী নেতা।

তাছাড়া ২০০৯ এ শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসেন অধিকাংশ জনগণের সমর্থনে। ২০১৩ তে বিএনপি ভোট বর্জন করে বলে এক শ্রেনীর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বা বিএনপি- জামায়াতপন্থীরা এই সরকারকে অনেকটা জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার বলতে চান না। তবে কোনও দল নির্বাচন বর্জন করলে কখনই কোন নির্বাচন অগ্রহনযোগ্য হয় না।

১৯৭০ এ ভাসানীর ন্যাপ নির্বাচন বর্জন করেছিলো। পূর্ব বাংলায় ওই অর্থে বঙ্গবন্ধুর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো না। তাতে বঙ্গবন্ধু যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা তাতে কোনও সন্দেহ ছিলো না। এখনও বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় শেখ হাসিনার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তাঁর জনপ্রিয়তা ৭০ ভাগের ওপরে। তাই ২০০৯ থেকে এই ২০১৮ অবদি শেখ হাসিনা ধাপে ধাপে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রতিবিপ্লবের চক্র থেকে বের করে আনছেন।

এখানে তিনি পরিপক্ক রাজনৈতিক নেতার মত সাফল্য অর্জনে কখনও কারো সঙ্গে আপস করছেন, আবার কখনো কারো সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করছেন। রাজপথের তথাকথিত আদর্শবাদীদের কাছে এই রাজনীতি অপরিচিত হতে পারে। কারণ, রাষ্ট্র ক্ষমতা ধরে রেখে দেশের রাজনীতিকে প্রতিবিপ্লবের চক্র থেকে বের আনার এই জটিল সমীকরণ তাদের জানা নেই। তবে এটাও সত্য এই তথাকথিত আদর্শবাদীরা শেখ হাসিনার রাজনীতির সহায়ক শক্তি। এবং তারা সুফলও পাচ্ছেন।

২০০৯ থেকে ২০১৬ অবধি শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে সেই সব পালের গোদাদের বিদায় করেছেন যারা সরাসরি যুদ্ধাপরাধী ছিলো। পরিপক্ক এই রাজনীতিক জানেন, রাজনীতিকে যতদিন না দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারা যাবে, যতদিন দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেয়া না যাবে- ততদিন এই যুদ্ধাপরাধী বা স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদীদের আশ্রয়স্থল নষ্ট হবে না। এ কারণে শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক যুদ্ধের আরেক অধ্যায় শুরু করেছেন এই দুর্নীতিবাজদের ওপর আঘাত করা।

এই আঘাত করার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সব থেকে বড় শক্তি তিনি পৃথিবীর অন্যতম একজন সৎ রাষ্ট্রনায়ক। বিএনপি অবশ্য বলছে, শেখ হাসিনা এখন বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতকে ব্যবহার করছেন। বাস্তবতা হলো শেখ হাসিনা আদালতের ব্যাপারে কোনও হস্তক্ষেপ করেননি। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, বেগম জিয়ার এই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার রায় আরো অনেক আগে শেষ হত যদি আদালত তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারতো। কিন্তু কেন আদালত নিজস্ব গতিতে চলতে পারেনি সে বিষয়ে লিখতে গেলে লেখা অন্যদিকে চলে যাবে। ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছে রইল।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বেগম জিয়ার পাঁচ বছর কারাদণ্ড হবার ভেতর দিয়ে প্রথমত বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু নয়, সমাজেও জিয়াউর রহমান যে দুর্নীতিকে অবাধ বলে চালু করেছিলেন তার একটা সমাপ্তির রেখা টানার কাজ শুরু হলো। এরপরে এ কাজে আরো গতি পাবে। যেমন, বেগম জিয়া, তারেক সহ আরো অনেককে আগামী কয়েককে মাসের ভেতর আরো কয়েকটি মামলার রায়ের মুখোমুখি হতে হবে।

এমনকি দ্রুত বিচার আদালতের মাধ্যমে বেগম জিয়াকে পেট্রলবোমা হামলায় মানুষ হত্যা মামলার রায়ের মুখোমুখিও হতে হবে। মূলত ২০১৮ বেগম জিয়াকে মামলা এবং সাজা নিয়েই কাটাতে হবে। তিনি খুব বেশি দিন জেলের বাইরে থাকতে পারবেন বলে মনে হয় না। অবশ্য তার দলের অনেক নেতা কর্মীরা মনে করছেন, জেলে থাকলে বেগম জিয়া আরো বেশি জনপ্রিয় হবেন। তাদের এই ধারণা ভুল।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতারা শুধু জেলে গিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন এমনটি ঠিক নয়। তাদের দীর্ঘ ধারাবাহিক ত্যাগের রাজনীতি ছিলো। জেলে যাওয়া সেই ত্যাগের এ্কটি অংশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু জেলে গিয়ে জনপ্রিয় হন এ কথা বললে বঙ্গবন্ধুকে খাটো করো হবে।

৪৮ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ অবধি যা ঘটেছে সব কিছুই বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে প্রস্তুত করা। জীবন -যৌবন সব তিনি ত্যাগ করেছেন দেশের মানুষের জন্যে। জেল জীবন তার সেই ত্যাগের একটি অংশ ছিলো। ১৯৬৯ যে গণঅভ্যূত্থান হয় সেটা বঙ্গবন্ধুরই ছয় দফার সঙ্গে ছাত্রদের ১১ দফা মিলিত হয়েই সৃষ্টি হয়। এই সব ঐতিহাসিক উদাহরণের বিপরীতে খালেদা ও তারেক রহমানের দুর্নীতি, চুরি ও মানুষ হত্যা ছাড়া মানুষের জন্যে কী কর্মসূচী আছে যেগুলোর জন্য তিনি জেলে বসে জনপ্রিয় হবেন?

খালেদা জিয়া জেলে গেছে তাতে তার কিছু অন্ধ ভক্ত কর্মী ও কিছু সুবিধাবাদী কষ্ট পাবে। সাধারণ মানুষের এতে কিছু যায় আসে না। বরং একের পর এক দুর্নীতি ও মানুষ হত্যার মামলার ভেতর দিয়ে খালেদা ও তারেক রহমানের দুর্নীতি ও হিংস্রতাই মানুষের সামনে আসবে। তাদের আসল রূপ মানুষের সামনে প্রকাশ পাবে। এতে তারা ঘৃণিত হবেন।

অন্যদিকে আরো একটি বিষয় রয়ে গেছে যা বিএনপির গঠনতন্ত্র। বিএনপি তাড়াহুড়ো করে একটি গঠনতন্ত্র পুনরায় জমা দিয়েছে নির্বাচন কমিশনে। নির্বাচন কমিশনকে সেটা পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষা করে তবেই সেটা গ্রহণ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন যদি সেটা গ্রহণ না করে, তাহলে বিএনপির নেতাদের একটি অংশ মিলিত হয়ে খালেদাকে বহিষ্কার করে তারাই মূল বিএনপি বলে দাবী করতে পারে।

কারণ খালেদার সাজা হয়েছে এক দুর্নৗতি ও নৈতিকস্খলনের কারণে। এটা তাদের গঠনতন্ত্র বিরোধী- তাই গঠনতন্ত্র ধরে তারা তাকে বহিষ্কার করতে পারেন। সামরিক শাসক সৃষ্ট দলগুলোতে এ খেলা বার বার দেখা যায়। মুসলিম লীগেও দেখা গিয়েছিলো।

জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগকে নিয়ে এ খেলা খেলতে গিয়ে ব্যর্থ হন। পরে ভাসানী ন্যাপ ও মুসলিম লীগ নিয়ে খেলেন। এমনকি জিয়াউর রহমান জোর করে ভাসানী ন্যাপের প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নেয়। খালেদা যদি বহিষ্কারের মুখে পড়েন তাহলে তিনিও হারাতে পারেন তার ধানের শীষ প্রতীক। তাই নিজের নির্বাচনে অংশ গ্রহণের যোগ্যতা হারানো, আরো কিছু মামলায় শাস্তি পাওয়া ও দলীয় প্রতীক হারানোর পরে খালেদার রাজনৈতিক শক্তি আর কতটুকু থাকবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে – সেটা এখন বড় প্রশ্ন।

বরং খালেদা ২০১৩ সালের চেয়েও যদি আরো বেশি রাজনৈতিক বলয় থেকে দূরে ছিটকে পড়েন তাহলে আশ্চর্য হবার কিছু নয়। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি সেদিকেই এগুচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের এই আশ্রয়স্থল ২০১৮ এর নির্বাচনের ভেতর দিয়ে ধ্বংস হতে পারে এমনটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাই বলা যায় ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

সৌজন্যেঃ বিডিনিউজ২৪.কম

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত