নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর প্রস্তাব

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর প্রস্তাব

গণতন্ত্র ও নির্বাচন : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সৃজন করতে শুরু করেন। মাত্র ৯ মাসের মধ্যে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’ প্রণয়ন করে দেশ পরিচালনা ও মানুষের অধিকার সংরক্ষণের সকল বিষয়ের সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত বিধান নিশ্চিত করেন। এই সংবিধানে Executive, Legislative ও Judiciary এমনকি বর্তমান সময়ের Media ও Civil Society সহ প্রতিটি বিভাগের জন্য সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা সন্নিবেশিত হয়, যার আলোকে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সকল সংস্থা গঠিত ও পরিচালিত হতে থাকে।

• বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ই ১৯৭২ সালে প্রনীত The Representation of People Order সহ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, যার অধীনে ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এই সময়ের মধ্যেই ধারাবাহিকভাবে দেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান সুসংগঠিত হয়ে উঠতে শুরু করে। গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের প্রতিটি পর্যায়ে কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত অপশক্তি ও তাদের এদেশীয় দোসররা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ রাতের আঁধারে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্তব্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা। খুনিচক্রের এই ভয়াবহতম নৃশংসতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সকল মানুষ বাকরুদ্ধ ও হতভম্ব হয়ে পরেন। • এই হত্যাকান্ডের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের হোতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও সেনা আইন লংঘন করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের সংবিধান ও সকল প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেন। শুরু হয় স্বৈরশাসনের।

এই স্বৈরশাসক তার অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দেয়ার অভিপ্রায়ে ১৯৭৭ সালের ৩০ মে হ্যাঁ/না ভোটের আয়োজন করেন এবং তার পক্ষে হ্যাঁ ভোট প্রদানের সকল আয়োজন সম্পন্ন করেন। জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে তার নিয়োজিত সন্ত্রাসী বাহিনী নির্বিচারে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে তোলে। প্রহসনের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ যেমন তাদের ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলেন অপরদিকে সকল গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়ে যায়। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে ১৯৯০ সালের ০৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যখন জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ক্ষমতা দখলকারী অপর স্বৈরশাসক হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ এর শাসনকালের অবসান ঘটে।

১৯৮১-১৯৯১ সাল পর্যন্ত জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যে সংগ্রাম করে আসছিলেন স্বৈরশাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে তার প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়। জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার পরিচালনায় রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রত্যার্বতন ঘটে। ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শুরু হলেও এর কার্যকর প্রতিফলন ঘটতে শুরু করে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় হতে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পুন:প্রবর্তনের পর সাবেক স্বৈরাচারের রাজনৈতিক দল বিএনপি, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী’র সমর্থনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সক্ষম হয়। জনমানুষের নির্বিঘœ ও নিরাপদে ভোটাধিকার প্রয়োগের পথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তারা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই বেগম খালেদা জিয়া তাঁর স্বামী স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আবারও কলুষিত করে তোলেন। মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। • ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ঢাকা (মিরপুর ও তেজগাঁও) ও মাগুরার উপ-নির্বাচনে এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত সকল রাজনৈতিক দল কর্তৃক বর্জিত ও ভোটার বিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে নজিরবিহীন কারচুপি ও অন্যায় সংঘটিত হয় তা বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করে।

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে বেগম খালেদা জিয়া ৩০ মার্চ ১৯৯৬ ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়ে পুনরায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হন।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর এই প্রথম দেশ পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল স্তরে কার্যকর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। একটি স্থায়ী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার গুনগত পরিবর্তন আনয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ দিনের অপশাসনের প্রতিবন্ধকতা অপসারন করে সম্মুখ পথে অগ্রসর হওয়া ছিল খুবই কষ্টকর। স্বাধীনতা-বিরোধী পরাজিত শক্তির যড়যন্ত্রের ফলে ২০০১ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক গৃহীত সকল উদ্যোগ বন্ধ করে দিয়ে দেশকে আবারও পিছন দিকে ঠেলে দেয়।

• এসময় একদিকে যেমন ‘বাঙলা ভাই’ এর নেতৃত্বে জঙ্গিবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা তার স্বরূপে আবির্ভূত হয়, অপরদিকে হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক দুর্নীতি ও অপশাসনের কালো ছায়ায় বাংলাদেশ প্রায় একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার জন্য প্রায় ১ কোটি ২৩ লক্ষ ভূয়া ভোটার দিয়ে বিএনপি-জামাত জোট যে ভোটার তালিকা তৈরী করে তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নিকৃষ্ট প্রহসন।

আবারও ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোটের পতন ঘটে এবং সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনকালে (২০০১-২০০৬) নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল এবং মহাজোটের অন্যান্য শরিকদল নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে একটি অভিন্ন রূপরেখা ঘোষণা করেন। এই রূপরেখায় নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং নির্বাচনী আইন ও বিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে মোট ৩০ দফা সুপারিশ করা হয়। এই সব প্রস্তাব সকল প্রচার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত ও আলোচিত হয়। প্রস্তাব সমূহের প্রতি দেশপ্রেমিক সকল নাগরিক ও সুশীল সমাজ অকুন্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। জনগনের দাবীর মুখে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলকে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব পেশ করতে আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে প্রস্তাবগুলি উত্থাপন করেন। তারপর সুদীর্ঘ সময় সরকার নানা কুট-কৌশলের মাধ্যমে কালক্ষেপন করতে থাকে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বিএনপি’র মহাসচিব এবং তাদের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সময়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করার সব রকম প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু দেশী-বিদেশী সকল চাপ উপেক্ষা করতে না পেরে এক পর্যায়ে তারা আলোচনায় বসতে সম্মত হলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল কর্তৃক উপস্থাপিত দাবী সমূহের প্রতি কোনরূপ ভ্রুক্ষেপই করেননি। কারন তারা জানতেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।

• ১৪ দল কর্তৃক উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলি ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও যুক্তিযুক্ত, যাকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: (১) নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামোগত বিষয় (২) নির্বাচনের পদ্ধতিগত ও বিধি-বিধানের বিষয়, এবং (৩) নির্বাচনকালীন অন্যান্য বিষয়াবলী। কিন্তু, জনরোষের মুখে ২০০৬ সালে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে বিএনপি-জামাত জোটের এই অনীহা অব্যাহত থাকে।

অবশেষে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে প্রবল জনমতের চাপে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে ১৪ দল উপস্থাপিত দাবী সমূহকে সক্রিয় বিবেচনায় নেয়া হয়। এসময় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল কর্তৃক পূর্বে প্রদত্ত ৩০ দফাকে আরও পরিশীলিত করে সর্বমোট ২৩ দফা দাবী উপস্থাপন করা হয়।

• বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর ২৩ দফার উপর ভিত্তি করেই ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স; নির্বাচনে পেশী শক্তি ও অর্থের ব্যবহার বন্ধ; নির্বাচনে অংশ গ্রহনেচ্ছুক প্রার্থীর সম্পদের বিবরণী প্রকাশ, চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণের পর পরই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নির্বাচনে অংশ গ্রহণের পথ বন্ধ করা, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধির তালিকা প্রণয়ন এবং সেখান থেকে মনোনয়ন প্রদান, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্য থেকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার নিয়োগসহ যে যে প্রক্রিয়ায় একটি নির্বাচন কলুষিত হতে পারে তার বিভিন্ন সংস্কার সাধন করা হয়। বিএনপি-জামাত জোটের করা ভোটার তালিকা হতে ১ কোটি ২৩ লক্ষ ভূয়া ভোটার বাদ দেয়া হয়।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দুই তৃতীয়াংশ ভোটে জয়যুক্ত হয়ে পুণরায় রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। শুরু হয় নতুন দিনের পথ চলা। ১৯৭১-১৯৭৫ এবং ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যে সকল জনমুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল তা পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানকে’ স্বরূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, আইন সভা ও নির্বাহী বিভাগসহ সকল স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি সাধনে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে শুরু করে।

• ইতোমধ্যে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন কমিশনের জন্য স্থায়ী সচিবালয় এবং নির্বাচন কমিশনের জন্য আর্থিক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সময়ে সময়ে প্রয়োজনমত সকল ধরনের সংস্কার সাধন করা হচ্ছে। অর্থাৎ এক কথায় একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা দরকার তার প্রায় সকল কিছুই পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এমনকি সার্চ কমিটির মাধ্যমে সর্বজন গ্রাহ্য ব্যক্তিদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগদানের প্রক্রিয়া গৃহীত হয়েছে। একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সংস্কার এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার উন্নয়নে যে সকল গুনগত পরিবর্তন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গৃহিত হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্র্তৃক দেশ পরিচালনার সময়ে।

১৯৭২ সালের The Representation of People Order (নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগনিত) প্রণীত হওয়ার পর দীর্ঘ সময়ে নির্বাচন সংক্রান্ত ২-৩ টি অধ্যাদেশ/আইন প্রণয়ন করা হলেও

• প্রয়োজনীয় সকল আইন বা অধ্যাদেশই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯-২০১৬ এই সময়ের মাঝে সম্পাদিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত প্রায় ৩২ টি অধ্যাদেশ/আইন প্রনয়ণ করা হয়েছে। আর এ সকল কিছুরই একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা; অর্থাৎ সংবিধান অনুযায়ী মানুষের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করা।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনে আগ্রহী বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে যাতে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সে লক্ষ্যে একদিকে যেমন পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায় নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতা ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হয় অপরদিকে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য (তফসিল ঘোষণার সময় হতে) ব্যতিক্রমী ভাবে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল দলের অংশ গ্রহণে একটি ‘অন্তর্বর্ন্তীকালীন সরকার’ গঠন করা হয়। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক বারবার আহবান জানোনো সত্ত্বেও তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াত জোট উক্ত সরকারে বা নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে।

• নির্বাচনে সকল দলের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং ঐ সময়ের বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান, এমনকি তাদের পছন্দনীয় নির্বাহী বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণেরও প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট নেত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও দেশের বিরাজমান সকল আইন-কানুনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন।

বিএনপি-জামায়াতের এই অশুভ জোট নির্বাচন বা নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ গ্রহণের পরিবর্তে নির্বাচন প্রতিহত করার নামে সারা দেশে এক নজির বিহীন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে মেতে ওঠে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ভূলুন্ঠিত করার অভিপ্রায়ে তারা একদিকে যেমন নির্বাচনী কেন্দ্রে অগ্নি সংযোগ করে অপরদিকে গণপরিবহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এবং সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় পেট্রোল বোমা মেরে অগ্নিসংযোগ করে সারা দেশে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। দেশী-বিদেশী নানা ধরনের অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সাধারণ মানুষের উপর নির্বিচারে আক্রমণ চালায়।

• ২৩ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় শতাধিক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী তাদের এই নৃশংসতার বলি হয়ে প্রাণ ত্যাগ করেন। বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করে। অসংখ্য ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়ে পড়েন। কিন্তু গণতন্ত্রকামী ও শান্তি প্রিয় এ দেশের জনগন এক পর্যায়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের এই সন্ত্রাসী তান্ডবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

• ঐ সময় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সকল সংস্থাকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যাস্ত করায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যথারীতি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত থাকে।

• কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোটের ষড়যন্ত্র বন্ধ হয় না। এই অপশক্তি ঠিক এক বছর পর পুণরায় ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে টানা প্রায় ৯৩ দিন বিনা কারনে দেশ ব্যাপী অবরোধ-হরতালের নামে ভয়াবহ ‘অগ্নি-সন্ত্রাস’ সৃষ্টি করে প্রায় ০২ শতাধিক মানুষকে পেট্রল বোমা মেরে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। তাদের এই নিকৃষ্টতম সন্ত্রাসী তান্ডবে আগুনে দগ্ধ হয় প্রায় ০২ সহস্রাধিক মানুষ মারাত্মক ভাবে আহত হয় এবং অনেকে চির পঙ্গুত্বের শিকার হন। এই তান্ডবে শতাধিক সরকারি ও অন্যান্য স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ এবং ২ সহস্রাধিক যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়। এতে প্রায় ০২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়, যা দিয়ে আরো প্রায় ১০ টি পদ্মা সেতুর মত স্থাপনা তৈরী করা সম্ভব হত।

• বর্বরতার কোন সীমা ছিল না তাদের এই পৈশাচিকতার। পুলিশ হত্যা, আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মচারীদের উপর হামলা, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আগুন, থানায় হামলা, থানা লুট, শত শত গণপরিবহনে অগ্নি সংযোগ; সি এন জি অটোরিক্সা, বাস, ট্রাক, রেলসহ এমন কোন পরিবহন নেই যেগুলোতে পেট্রল বোমা মেরে অথবা পেট্রল দিয়ে আগুন দেয়া হয় নাই। সারাদেশে তারা এক ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। কিন্তু বাংলাদেশের বীর জনগন এবারও এই অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, বন্ধ হয় তাদের বর্বর তান্ডব।
বিএনপি-জামায়াত জোট এবং তাদের পূর্বসুরী স্বৈরশাসকদের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে একটি বিষয়ে সহজেই পরিস্ফুট হয়ে উঠে, এই অপশক্তি কখনোই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী নয়।
• ২০১৩ সালে হেফাজতিদের তান্ডব, নির্বাচিত সরকার পতনের নীল নক্সা; ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভন্ডুল করে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা রুদ্ধ করার অপচেষ্টা এবং ২০১৫ সালের পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে ও অর্থ-সম্পদ ধ্বংস করে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে থামিয়ে দেয়া, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজকে ভণ্ডুল করা, গণতন্ত্র ধ্বংস এবং জনগনের ম্যান্ডেটের পরিবর্তে অন্য কোন অবৈধ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে জনগনের সহায় সম্পদ লুন্ঠন করাই এই জোটের প্রধান লক্ষ্য।

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এর আলোকে গণতন্ত্র ও জনমানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারাবদ্ধ। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবেশী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায় বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও আইনের মাধ্যমে একটি কার্যকর নির্বাচন কমিশনে পরিণত করা হয়েছে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের বিধান করা হয়েছে। এতদ্সত্ত্বেও যদি কোন গোষ্ঠী বা সংস্থা দেশের সংবিধান বা বিরাজমান আইন-কানুনের বাইরে গিয়ে অন্য কোন পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে তা দেশের শান্তিকামী জনগন কখনই মেনে নিবে না।
একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যে সকল বিষয়গুলি অতীব গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে :

১। একটি স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন
২। নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাহী বিভাগের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/সংস্থার দায়িত্বশীলতা
৩। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও এর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ আচরণ।
৪। ছবিযুক্ত একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা এবং ভোট গ্রহণের দিন নির্বাচন কেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা।
৫। নির্বাচন পরিচালনায় বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের পরিবর্তে কেবলমাত্র প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা/কর্মচারীদের প্রিজাইডিং অফিসার থেকে পোলিং অফিসার পদে নিয়োগ করা।
৬। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সদস্যদের নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল আচরণ।
৭। দেশী/বিদেশী পর্যবেক্ষক থেকে শুরু করে মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটির সদস্যদের নির্মোহ তৎপরতা।
৮। নির্বাচনে পেশীশক্তি ও অর্থের প্রয়োগ বন্ধ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সকল পর্যায়ের ভোটারের অবাধ ভোটদানের সুযোগ নিশ্চিত করা ।
৯। নির্বাচনের পূর্বে ও পরে এবং নির্বাচনের দিন ভোটারসহ সর্বসাধারণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
১০। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ নির্বাচন পরিচালনার জন্য আবশ্যকীয় সকল সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত করা। এবং
১১। নির্বাচনকালীন সরকারের কর্মপরিধি কেবলমাত্র আবশ্যকীয় দৈনন্দিন (রুটিন) কার্যাবলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা।

উপরে বর্ণিত বিষয়সমূহ তখনই সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পাদিত হতে পারে যখন প্রতিটি সংস্থা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন করবে। স্বাধীনতার পর হতে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বেগম খালেদা জিয়া ও তার পূর্বসুরী স্বৈরশাসক এরশাদ ও জিয়াউর রহমানের শাসন কালে নানাভাবে সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বারবার কলুষিত করা হয়েছে।

• ২০০৮ সালে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক উপস্থাপিত ২৩ দফার উপর ভিত্তি করে প্রথমে ঐ সময়কার সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে অদ্যাবধি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিটির জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন’ পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় বর্তমানে সর্বাধিক ক্ষমতা ও দক্ষতার সাথে তাঁদের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হচ্ছে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি নির্বাচন প্রত্যাশী সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন (Selection) করার ক্ষেত্রে নির্বাচনে অংশ গ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহেরও গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল আচরণ খুবই জরুরী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দৃষ্টান্ত অনুসরণ যোগ্য।

• বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই সর্বপ্রথম ২০০৮ এর নির্বাচনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভোটের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের বাছাই করে পরবর্তীতে নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় নির্বাচনী বোর্ডের মাধ্যমে প্রার্থী চুড়ান্ত করে। প্রায় ১ (এক) কোটি নেতাকর্মী এই প্রক্রিয়ায় সামিল হয়ে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবং বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রার্থী বাছাইয়ের এই ধারা অব্যহত থাকে। ২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী বাছাইয়ের এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বদ্ধ পরিকর।

নির্বাচন প্রক্রিয়ার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কর্তৃক নিয়োজিত পোলিং এজেন্টদের ভূমিকা। নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে পোলিং এজেন্টদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কেন্দ্রের ভোটারদের মধ্য থেকে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করা হলে নির্বাচনে জাল ভোট প্রয়োগের প্রবণতা প্রায় বন্ধ করা সম্ভব। বিভিন্ন সময়ে লক্ষ্য করা গিয়েছে প্রধান দুই/একটি রাজনৈতিক দল ব্যতীত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পোলিং এজেন্টগণ হয় নির্বাচন কেন্দ্রে যান না অথবা নির্বাচন শুরু হওয়ার ২/১ ঘন্টার মধ্যেই নির্বাচন কেন্দ্রের বাইরে এসে মনগড়া বিভিন্ন গুজব ছড়াতে থাকে। এ লক্ষ্যে যদিও নির্বাচন আচরণ বিধিমালা প্রণীত হয়েছে, তথাপি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দল কর্তৃক নিয়োজিত পোলিং এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বাধিক সর্তক হওয়া আবশ্যক।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষনার পর হতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত নির্বাচন পরবর্তী সময়ের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

• দুই/একটি রাজনৈতিক দল বা সংস্থা এবং কতিপয় ব্যক্তি জ্ঞাত/অজ্ঞাতসারে অথবা কোন অসৎ অভিপ্রায়ে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অর্ন্তভূক্ত বা নির্বাচনকালীন সময়ে তাদের নিয়োগের বিষয়ে দাবী উত্থাপন করে একদিকে যেমন দেশের বিরাজমান আইন ও সাংবিধানিক নিয়মকানুনের প্রতি অসৌজন্যতা প্রদর্শন করেন অপরদিকে সামগ্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস চালান। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ করা যাবে ১৮৯৮ সালে প্রণীত ফৌজদারী কার্যবিধির ১২৯-১৩২ ধারায় সুস্পষ্টভাবে তার উল্লেখ রয়েছে।

উপরন্ত বর্তমানে পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও আনসারসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল ও সক্ষমতা পূর্ববর্তী যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

নির্বাচনকালীন সময়ে ম্যাজেস্ট্রিয়াল ক্ষমতা প্রদানের বিষয় নিয়ে প্রায়শই আর একটি বিতর্ক সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালানো হয়। অথচ এক্ষেত্রেও আইনের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

• নির্বাচনে প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য ও নির্বাচন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের ম্যাজেস্ট্রিয়াল ক্ষমতা প্রদানের বিষয়ে যারা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা নয়, প্রকারান্তরে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করাই তাদের অভিষ্ট লক্ষ্য। ২০০১ সালের নির্বাচনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেই এই বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।

ঐ নির্বাচনে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের পূর্বেই স্বস্ব নির্বাচনী এলাকা থেকে বিতাড়ন/অন্যায়ভাবে গ্রেফতার ও নির্যাতন করে একদিকে যেমন জনমনে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করা হয়, অপরদিকে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমথর্ন করে এমন ব্যক্তিদের ভোট কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করা হয় এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ‘নৌকা’ প্রতীকে ভোট দেয়ার অপরাধে, ক্ষেত্র বিশেষে কেবলমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় গিয়ে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী; বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী; এবং সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যসহ আওয়ামী নেতা-কর্মীদের উপর এক বিভীষিকাময় নিপীড়ন চালনো হয়।

• এসময় শিশু পুর্ণিমা, রাজুফা, ফাতেমা, মাহিমাসহ অগণিত নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ এর নামে সেনা বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এমন জনমানুষের উপর নির্বিচারে অত্যাচার ও অনেককে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না থাকায় তৎকালীন নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে জনমানুষকে এই নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।

নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত ও ত্রুটিযুক্ত করার ক্ষেত্রে হেন কোন প্রক্রিয়া নাই যা বেগম খালেদা জিয়া ও তার পূর্বসুরীগণ অনুসরণ করেন নাই। এরা একদিকে যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিশ্বাসী ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদান করেছেন, তেমনি ১ কোটি ২৩ লক্ষ ভূয়া ভোটারকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে এবং ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিশেষ উদ্দেশ্যে জেলা ও উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রদানসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম অপব্যবহার করে বাংলাদেশের সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থাকেই বিনষ্ট করা হয়।

• এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের অভিপ্রায়েই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন যার সুফল আজকের নির্বাচন কমিশন।

• ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ই-ভোটিং এর প্রবর্তন, নির্বাচনে অর্থ ও পেশীশক্তির ব্যবহার রোধে নানাবিধ আইন ও বিধি প্রণয়ন, নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা তৈরী, তৃণমূলের ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই, দেয়াল লিখন ও রঙিন পোস্টারের পরিবর্তে সাদা-কালো পোস্টারের প্রবর্তন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় স্থাপন এবং নির্বাচন কমিশনকেই তাদের নিজস্ব জনবল নিয়োগের ক্ষমতা অর্পন, প্রয়োজনীয় আর্থিক তহবিল প্রদান, সাধারণ প্রশাসনের উপর নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধান, নির্বাচনী অপরাধ প্রতিরোধে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর নেতৃত্বে পর্যাপ্ত সংখ্যক ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা, এবং যানবাহনের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামগ্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যে দৃশ্যমান উন্নতি সাধিত হয়েছে তার সকল কিছুর মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগ কর্তৃক উপস্থাপিত ২৩ দফা।

• এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত সাংবিধানিক পদের অধিকারীদের সমন্বয়ে সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইলেকশন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নির্বাচনে জনমানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিতকল্পে দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

উপরে বর্ণিত সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর প্রস্তাবসমূহ নিম্নরূপঃ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও দেশের বিরাজমান সকল আইন-কানুনের উপর শ্রদ্ধাশীল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সুগভীর প্রজ্ঞা ও সুবিবেচনার প্রতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গৃহীত যে কোন ন্যায়সঙ্গত উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পরিপূর্ণ সমর্থন থাকবে।

প্রস্তাবসমূহ

(ক) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮ এর বিধান অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগদান করবেন।
(খ) প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে মহামান্য রাষ্ট্রপতি যেরূপ উপযুক্ত বিবেচনা করবেন, সেই প্রক্রিয়ায় তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ প্রদান করবেন।
(গ) প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে সম্ভব হলে এখনই একটি উপযুক্ত আইন প্রণয়ন অথবা অধ্যাদেশ জারি করা যেতে পারে। সময় স্বল্পতার কারণে আগামী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তা সম্ভব না হলে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের সময় যাতে এর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এর নির্দেশনার আলোকে এখন থেকেই সে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
(ঘ) সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বর্তমানে বিরাজমান সকল বিধিবিধানের সাথে জনমানুষের ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ই-ভোটিং’ এর প্রবর্তন করা।

TOP