সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রস্তাবনা

 

নির্বাচন কমিশনের নিকট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রস্তাবসমূহ

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অধিকতর সুষ্টু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য করার অভিপ্রায়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর প্রস্তাবসমূহ নিম্নরুপঃ

১। ইংরেজী ভাষায় প্রণীত “ the Representation of the people order, 1972’’ ও ‘’ The Delimitation of constituencies ordinance, 1976’’ এর বাংলা সংস্করণ প্রণয়নের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকবে (RPO এর অনুচ্ছেদ ৯৪/এ অনুসরণ যোগ্য)
২। নির্বাচনে অবৈধ অর্থ এবং পেশীশক্তির ব্যবহার রোধকল্পে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত নির্বাচন সংক্রান্ত নির্দেশনা এবং বিদ্যমান নির্বাচনী আইন ও বিবিধমালা নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।
৩। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত এবং নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি বা সংস্থার অপেশাদার ও দায়িত্বহীন আচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪। নির্বাচন পরিচালনায় কেবলমাত্র প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বশীল কর্মচারীদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার পদে নিয়োগ করা।
৫। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের বাছাই করে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী চুড়ান্ত করা।
৬। নির্বাচন পর্যবেক্ষনের ক্ষেত্রে দেশী ও বিদেশী পর্যবেক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও সতর্কতা অবলম্বন করা। কোন ভাবেই কোন বিশেষ দল বা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যশীল হিসেবে পরিচিত বা চিহ্নিত ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংস্থাকে নির্বাচন প্ররযবেক্ষণে দায়িত্ব প্রদান না করা।
৭। নির্বাচনের দিন ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ সকল গণমাধ্যম কর্মীদের নির্বাচনী বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দায়িত্ব পালনের জন্য কার্যকর নির্দেশনা প্রদান। গণমাধ্যম কর্মীদের উপযুক্ত পরিচয়পত্র প্রদান ও তাদের দায়িত্ব কর্ম এলাকা নির্ধারণ করা।
৮। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়োজিত পোলিং এজেন্টদের তালিকা ছবিও NID সহ (কেন্দ্র ভিত্তিক) নির্বাচন অনুষ্ঠানের কমপক্ষে ০৩ দিন পূর্বে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নিকট প্রদান নিশ্চিত করা এবং প্রিজাইডিং অফিসার কর্তৃক তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ভোট কক্ষে প্রবেশ ও নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থানের অনুমতি প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা।
৯। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বর্তমানে বিরাজমান সকল বিধিবিধানের সাথে জনমানুষের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের ন্যায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ইভিএম’ এর মাধ্যমে ভোটদান প্রবর্তন করা।
১০। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর হতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত নির্বাচন পরবর্তী সময়ের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর ন্যস্ত থাকবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ করা যাবে ১৮৯৮ সালে প্রণীত ফৌজদারী কার্যবিধির ১২৯-১৩১ ধারায় এবং সেনা বিধিমালায় In aid to civil power শিরোনামে সুস্পষ্ঠভাবে তার উল্লেখ রয়েছে।
১১। Delimitation বিষয়টি জনসংখ্যা বিশেষ করে আদমশুমারীর সাথে সম্পর্কিত। সর্বশেষ ২০১১ সালে আদমশুমারীর উপর ভিত্তি করে ( যা ২০১৩ সালে প্রকাশিত) ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পূর্বে Delimitation করা হয়েছে। নতুন আদমশুমারী ব্যতীত পুনরায় Delimitation কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে বিভিন্ন আইনগত জটিলতা সৃষ্ঠি হতে পারে।

বিজ্ঞ কমিশন নিশ্চয়ই অবগত রয়েছেন, ২০১৮ সালের শেষ দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এমতাবস্থায় ৩০০ আসনের Delimitation এর মত একটি জটিল কার্যক্রম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যেসব আইনানুগ পদক্ষেপ গৃহীত হয়ে থাকে; তথা খসড়া থেকে আপীল নিষ্পত্তি পর্যন্ত যে মহা কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে হয় তা সময় স্বল্পতার কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না সে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া অত্যাবশ্যক। কমিশনের সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়াও স্থানীয় সরকারের অনেকগুলো নির্বাচন রয়েছে। সবদিক ভেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুরোধ করছি।

নির্বাচন কমিশনের নিকট আকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রস্তাব

তারিখঃ ১৮ অক্টোবর, বুধবার, সকাল ১১-০০টা

গনতন্ত্র ও নির্বাচনঃ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিস্নগবাদিত নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সৃজন করতে শুরু করেন। মাত্র ৯ মাসের মধ্যে ‘গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’ প্রণয়ন করে দেশ পরিচালনা ও মানুষের অধিকার সংরক্ষণের সকল বিষয়ের সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত বিধান নিশ্চিত করেন। এই সংবিধানে Executive, Legislative ও Judiciary এমনকি বর্তমান সময়ের Media ও Civil Society সহ প্রতিটি বিভাগের জন্য সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা সন্নিবেশিত হয়, যার আলোকে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সকল সংস্থা গঠিত ও পরিচালিত হতে থাকে।

- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ই ১৯৭২ সালে প্রণীত The Representation of the People Order সহ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহন করা হয়, যার অধীনে ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই সময়ের মধ্যেই ধারাবাহিকভাবে দেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান সুসংগঠিত হয়ে উঠতে শুরু করে। গনতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের প্রতিটি পর্যায়ে কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত অপশক্তি ও তাদের এদেশীয় দোসররা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ রাতের আঁধারে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্তব্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা। খুনিচক্রের এই ভয়াবহতম নৃশংসতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সকল মানুষ বাকরুদ্ধ ও হতভম্ব হয়ে পরেন।

- এই হত্যাকান্ডের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের হোতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও সেনা আইন লংঘন করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষনা করেন। বাংলাদেশের সংবিধান ও সকল প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেন। শুরু হয় স্বৈরশাসনের। এই স্বৈরশাসক তার অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দেয়ার অভিপ্রায়ে ১৯৭৭ সালের ৩০ মে হ্যাঁ/না ভোটের আয়োজন করেন এবং তার পক্ষে হ্যাঁ ভোট প্রদানের সকল আয়োজন সম্পন্ন করেন। জনগণের ভোতাধিকার হরণ ক্রে তার নিয়জিত সন্ত্রাসী বাহিনী নির্বিচারে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে তোলে। প্রহসনের এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে সাধারন মানুষ যেমন তাদের ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলেন অপরদিকে সকল গনতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়ে যায়। এই ধারাবাহিকতায় অব্যাহত থাকে ১৯৯০ সালের ০৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যখন জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরন করে ক্ষমতা দখলকারী অপর স্বৈরশাসক হুসেইন মোহাম্মাদ এরশাদ এর শাসনকালের অবসান ঘটে।

১৯৮১-১৯৯১ সাল পর্যন্ত জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আপামর জনসাধারনকে সঙ্গে নিয়ে গনতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যে সংগ্রাম করে আসছিলেন স্বৈরশাসনের অবসানের মধ্যে দিয়ে তার প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়। জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার পরিচালনায় রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন ব্যাবস্থা থেকে সংসদীয় গনতন্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন ঘটে। ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শুরু হলেও এর কার্যকর প্রতিফলন ঘটতে শুরু করে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় হতে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের পর সাবেক স্বৈরাচারের রাজনৈতিক দল বিএনপি, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী’র সমর্থনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সক্ষম হয়। জনমানুষের নির্বিঘ্ন ও নিরাপদে ভোটাধিকার প্রয়োগের পথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তারা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই বেগম জিয়া তার স্বামী স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আবারও কলুষিত করে তোলেন। মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়।

- ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ঢাকা (মিরপুর ও তেজগাঁও) ও মাগুরার উপ-নির্বাচনে এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী, অনুষ্টিত সকল রাজনৈতিক দল কতৃক বর্জিত ও ভোটার বিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে নজিরবিহীন কারচুপি ও অন্যায় সংঘটিত হয় তা বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল কতৃক বর্জিত ও ভোটার বিহীন এই অবৈধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করে এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনীদের রাজনৈতিক দল ( যা বিএনপি’র পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত) ফ্রিডম পার্টিকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসায়। এই অবস্থার মধ্য দিয়ে বিএনপি নির্বাচন ও গনতান্ত্রীক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সকল কিছুই ধ্বংস করে দেয়। ফুঁসে উঠে বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগন। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে বেগম খালেদা জিয়া ৩০ মার্চ ১৯৯৬ ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়ে পুনরায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হন।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্টিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহন করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর এই প্রথম দেশ পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল স্তরের কার্যকর পুনঃগঠন শুরু হয়।

একটি স্থায়ী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় গুনগত পরিবর্তন আনয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ দিনের অপশাসনের প্রতিবন্ধকতা অপসারন করে সম্মুখ পথে অগ্রসর হওয়া ছিলো খুবই কষ্টকর। স্বাধীনতা-বিরোধী পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্রের ফলে ২০০১ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কতৃক গৃহীত সকল উদ্যোগ বন্ধ করে দিয়ে দেশকে আবারও পিছন দিকে ঠেলে দেয়।

২০০১ সালের ১লা অক্টোবরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার জন্য পরিকল্পিত উপায়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এ সময় নির্বিচারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এমন সকল ভোটার বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর এক নারকীয় তান্ডব চালানো হয়। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় তাদেরকে নির্বাচনী এলাকা থেকে বিতাড়িত করা হয়। অনেক নেতাকর্মীকে পঙ্গু এবং মারাত্মকভাবে জখম ও হত্যা করা হয়। অন্যায়ভাবে গ্রেফতার ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন জনমনে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করা হয়, অপরদিকে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এমন ব্যক্তিদের ভোট কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করা হয়।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কেবলমাত্র ‘নৌকা’ প্রতীকে ভোট দেয়ার অপরাধে, ক্ষেত্র বিশেষে শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় দিয়ে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, এবং সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর, খুলনাসহ দেশের প্রায় সকল জেলায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যসহ আওয়ামী নেতা-কর্মীদের উপর এক বিভীষিকাময় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করে।

- এসময় শিশু পুর্ণিমা, রাজুফা, ফাতেমা, মাহিমাসহ অগণিত নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নাম দিয়ে সেনা বাহিনী ও আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এমন জনমানুষের উপর নির্বিচারে অত্যাচার ও অনেককে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়।

- ২০১০ সালে মহামান্য আদালতের নির্দেশনায় বিএনপি-জামাত কর্তৃক পরিচালিত নারকীয় তান্ডবের বিষয়ে তদন্ত করে দেখার জন্য একটি বিশেষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়-

- ২০০১ সালের ০১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিএনপি- জামায়াত এর চার দলীয় জোটের সন্ত্রাসী দ্বারা ৪৩ জেলায় ৬২টি স্থানে ৩৪২ জন শিশুকে ধর্ষন, নির্বিচারে গণধর্ষন, লুন্ঠন, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলার মত ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ জায়গায় নারী ও শিশু কন্যাদের টার্গেট করে হামলা চালানো হয় এবং জমি, বসতবাড়ি ও দোকানসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে নেয়া হয়।

- বাগেরহাটের ফকিরহাটে বাবা-মার সামনে ১৩ বছরের একটি মেয়েকে ২২ জন ধর্ষন করে হত্যা করে। কত বীভৎস ও পাশবিক হতে পারে তাদের নির্মমতা, তা এই একটি ঘটনার মধ্য দিয়েই ফুটে উঠে।

- তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে ৩৬২৫টি ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৩৫৫টি খুন এবং ৩০০০ এর উপর ধর্ষন, অগ্নিসংযোগ ও লুটের ঘটনা রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত এর এই বর্বরতা তাদের অবশিষ্ট শাসনকালেও অব্যাহত থাকে। ২০০৩-২০০৬ পর্যন্ত প্রায় ১৪,০০০ সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ২০০১ সালের ০১ অক্টোবর নির্বাচনে সীমাহীন কারচুপি ও নির্বাচন পরবর্তী পৈশাচিকতার বিষয়ে “A Rigged Election and an Illegitimate Government (Bangladesh election 2001) " এবং “Valley of Death” সহ অনেক গ্রন্থে এর মর্মস্পর্শী বিবরণ রয়েছে যা ঐ সময়কার বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমে ব্যপক প্রচারিত হয়।

- কার্যত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না থাকায় তৎকালীন নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে জনমানুষকে এই নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।

- ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনকালে একদিকে যেমন সারাদেশে ‘বাংলা ভাই’ এর নেতৃত্বে জঙ্গিবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা তার স্বরূপে আবির্ভূত হয়, অপরদিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কালো ছায়ায় বাংলাদেশ প্রায় একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ২০০১ সালের ন্যায় কারচুপির মাধ্যমে পরবর্তী জাতীয় সংসসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার জন্য প্রায় ১ কোটি ২৩ লক্ষ ভূয়া ভোটার দিয়ে বিএনপি-জামাত জোট যে ভোটার তালিকা তৈরী করে তা ছিলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নিকৃষ্ট প্রহসন।

- এমনকি মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের চিহ্নিত ব্যাক্তিদের বিশেষ উদ্দেশ্যে জেলা ও উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রদানসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম অপব্যবহার করে বাংলাদেশের সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থাকেই বিনষ্ট করে দেয়া হয়।

কিন্তু আবারও ব্যাপক গনআন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের পতন ঘটে এবং সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনকালে (২০০১-২০০৬) নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল এবং মহাজোটের অন্যান্য শরিকদল নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে একটি অভিন্ন রূপরেখা ঘোষনা করেন। এই রুপরেখায় নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং নির্বাচনী আইন্ন ও বিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে মোট ৩০ দফা সুপারিশ করা হয়।

এই সব প্রস্তাব সকল প্রচার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত ও আলোচিত হয়। প্রস্তাব সমূহের প্রতি দেশপ্রেমিক সকল নাগরিক ও সুশীল সমাজ আকুন্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। জনগনের দাবীর মুখে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলকে জাতীয় সংসদে প্রস্তাবগুলি উত্থাপন করেন। তারপর সুদীর্ঘ সময় সরকার নানা কুট-কৌশলের মাধ্যমে কালক্ষেপন করতে থাকে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বিএনপি’র মহাসচিব এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সময়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করার সব রকম প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু দেশী-বিদেশী সকল চাপ উপেক্ষা করতে না পেরে এক পর্যায়ে তারা আলোচনায় বসতে সম্মত হলেও আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে ১৪ দল কতৃক উপস্থাপিত দাবীসমূহের প্রতি কোনরূপ ভ্রুক্ষেপই করেননি। কারন তারা জানতেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।

- ১৪ দল কর্তৃক উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলো ছিলো অতন্ত বাস্তবসম্মত ও যুক্তিযুক্ত, যাকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়ঃ
(১) নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামোগত বিষয়
(২) নির্বাচনের পদ্ধতিগত ও বিধি-বিধানের বিষয়, এবং
(৩) নির্বাচনকালীন অন্যান্য বিষয়াবলী। কিন্তু, জনরোষের মুখে ২০০৬ সালে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে বিএনপি-জামাত জোটের অনীহা অব্যাহত থাকে।

অবশেষে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে প্রবল জনমতের চাপে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে ১৪ দল উপস্থাপিত দাবীসমূহ সক্রিয় বিবেচনায় নেয়া হয়। এসময় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল কতৃক পূর্বে প্রদত্ত ৩০ দফাকে আরও পরিশীলিত করে সর্বমোট ২৩ দফা দাবী উপস্থাপন করা হয়।

- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর ২৩ দফার উপর ভিত্তি করেই ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের প্রচলন নির্বাচনে পেশী শক্তি ও অর্থের ব্যবহার বন্ধ; নির্বাচনে অংশ গ্রহণেচ্ছুক প্রার্থীকে সম্পদের বিবরণী প্রকাশ, চাকুরী থেকে অবসর গ্রহনের পর পরই প্রজাতন্তের কর্মচারীদের নির্বাচনে অংশ গ্রহনের পথ বন্ধ করা, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধির তালিকা প্রণয়ন এবং সেখান থেকে মনোনয়ন প্রদান, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্য থেকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার নিয়োগসহ যে যে পক্রিয়ায় একটি নির্বাচন কলুষিত হতে পারে তার বিভিন্ন সংস্কার সাধন করা হয়। বিএনপি-জামাত জোতের নির্দেশনায় প্রণীত ভৌতিক ভোটার তালিকা হতে ১ কোটি ২৩ লক্ষ ভূয়া ভোটার বাদ দেয়া হয়।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দুই তৃতীয়াংশ ভোটে জয়যুক্ত হয়ে পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার দ্বায়িত্বভার গ্রহন করে। শুরু হয় নতুন দিনের পথ চলা। ১৯৭১-১৯৭৫ এবং ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যে সকল জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছিল তা পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। ‘গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানকে’ স্বরূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, আইন সভা ও নির্বাহী বিভাগসহ সকল স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি সাধনে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে শুরু করে।

ইতোমধ্যে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন কমিশনের জন্য আর্থিক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সময়ে সময়ে প্রয়োজনমত সকল ধরনের সংস্কার সাধন করা হচ্ছে। অর্থাৎ এক কথায় একটা স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা দরকার তার প্রায় সকল কিছুই পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এমনকি সার্চ কমিটির মাধ্যমে সর্বজন গ্রাহ্য ব্যক্তিদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি কতৃক সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনের পদে নিয়োগদানের প্রক্রিয়া গৃহীত হয়েছে। একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সংস্কার এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার উন্নয়নে যে সকল গুণগত পরিবর্তন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক দেশ পরিচালনার সময়ে।

১৯৭২ সালের The Representation of the People Order ( নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত) প্রনীত হওয়ার পর দীর্ঘ সময়ে নির্বাচন সংক্রান্ত ২-৩ টি অধ্যাদেশ/আইন প্রণয়ন করা হলেও প্রয়োজনীয় সকল আইন বা অধ্যাদেশই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯-২০১৬ এই সময়ের মাঝে সম্পাদিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত প্রায় ৩২ টি অধ্যাদেশ/আইন প্রনয়ন করা হয়েছে। আর এ সকল কিছুরই একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা ; অর্থাৎ সংবিধান অনুযায়ী মানুষের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করা।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনে আগ্রহী বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে যাতে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সকলের নিকট গ্রহনযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সে লক্ষ্যে একদিকে যেমন পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায় নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতা ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হয় অপরদিকে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য (তফসিল ঘোষণার সময় হতে) ব্যতিক্রমী ভাবে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল দলের অংশ গ্রহণে একটি ‘অন্তঃবর্তীকালীন সরকার’ গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক বারবার আহবান জানানো সত্ত্বেও তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াত সরকারের বা নির্বাচনে অংশগ্রহন থেকে বিরত থাকে।

- নির্বাচনে সকল দলের অংশ গ্রহন নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসীনা স্বয়ং ঐ সময়ের বিরোধী দলের নেত্রী বেগগ খালেদা জিয়াকে নির্বাচন ওন নির্বাচনকালীন অন্তঃবর্তীকালীন সতকারে অংশগ্রহণের আমন্ত্রন জানান, এমনকি তাদের পছন্দনীয় নির্বাহী বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণেরও প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট নেত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও দেশের বিরাজমান সকল আইন-কানুনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন।

বিএনপি-জামায়াতের এই অশুভ জোট নির্বাচন বা নির্বাচনকালীন সরকারের অংশ গ্রহণের পরিবর্তে নির্বাচন প্রতিহত করার নামে সারা দেশে এক নজির বিহীন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে মেতে ওঠে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ভূলুন্ঠিত করার অভিপ্রায়ে তারা একদিকে যেমন নির্বাচনী কেন্দ্রে অগ্নি সংযোগ করে অপরদিকে গণপরিবহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এবং সাধারন মানুষের যানবাহন ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় পেট্রোল বোমা মেরে অগ্নিসংযোগ এর মাধ্যমে সারা দেশে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এমনকি সরাসরি গণমানুষকে লক্ষ করে প্রেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে; যার ফলে বহু মানুষ নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করে ও অসংখ্য মানুষ মারাত্মক ভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। দেশী-বিদেশী নানা ধরনের অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সাধারন মানুষের উপর নির্বিচারে আক্রমন চালায়।

বিএনপি-জামায়াতের জোট এবং তাদের পূর্বসুরী স্বৈরশাসাকদের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে একটা বিষয়ে সহজেই পরিস্ফুট হয়ে উঠে, এই অপশক্তি কখনোই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী নয়।

- বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থন ও প্ররোচানায় ২০১৩ সালে হেফাজতিদের তান্ডব, নির্বাচিত সরকার পতনের নীল নক্সা; ২০১৪ সালএ জাতীয় নির্বাচন ভণ্ডুল করে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা রুদ্ধ করার অপচেষ্টা এবং ২০১৫ সালের পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে ও অর্থ-সম্পদ ধ্বংস করে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে থামিয়ে দেয়া, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজকে ভণ্ডুল করা, গণতন্ত্র ধ্বংস এবং জনগনের ম্যান্ডেটের পরিবর্তে অন্য কোন অবৈধ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে জনগনের সহায় সম্পদ লুন্ঠন করাই এই জোটের প্রধান লক্ষ্য।

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এর আলোকে গনতন্ত্র ও জনমানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারাবদ্ধ। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবেশী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায় বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও আইনের মাধ্যমে একটি কার্যকর নির্বাচন কমিশনে পরিনত করা হয়েছে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের বিধান করা হয়েছে। এতদাসত্ত্বেও যদি কোন গোষ্ঠী বা সংস্থা দেশের সংবিধান বা বিরাজমান আইন-কানুনের বাইরে গিয়ে অন্য কোন পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে তা দেশের শান্তিকামী জনগণ কখনই মেনে নিবে না।

সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন

স্বাধীনতার পর হতে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বেগম খালেদা জিয়া ও তার পূর্বসুরী স্বৈরশাসক এরশাদ ও জিয়াউর রহমানের শাসনকালে নানাভাবে সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বারবার কলুষিত করা হয়েছে। এমনকি অবৈধভাবে ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়া বিএনপি, জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বঘোষিত খুনিদের দিয়ে রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করে সেই রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করে সেই রাজনৈতিক দলকে নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে তাকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী জামায়েত-ই-ইসলামী এবং বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের রাজনৈতিক দল ফ্রিডম পার্টির হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে, শুধু যে নির্বাচন ব্যবস্থারই ধ্বংস সাধন করা হয়েছিল তাই নয়, এই অপশক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকেই নস্যাৎ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।

একটি সুষ্ঠ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যে সকল বিষয়গুলি অতীব গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে :
১। একটি স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন।
২। নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাহী বিভাগের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/সংস্থার দায়িত্বশীলতা।
৩। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও এর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ আচরণ।
৪। ছবিযুক্ত একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা এবং ভোট গ্রহনের দিন নির্বাচন কেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা।
৫। নির্বাচন পরিচালনায় বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের পরিবর্তে কেবলমাত্র প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা/কর্মচারীদের প্রিজাইডিং অফিসার/সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার/পোলিং অফিসার পদে নিয়োগ করা।
৬। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সদস্যদের নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল আচরণ।
৭। দেশী/বিদেশী পর্যবেক্ষক থেকে শুরু করে মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটির সদস্যদের নির্মোহ তৎপরতা।
৮। নির্বাচনে পেশীশক্তি ও অর্থের প্রয়োগ বন্ধ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সকল পর্যায়ের ভোটারের অবাধ ভোটদানের সুযোগ নিশ্চিত করা।
৯। নির্বাচনের পূর্বে ও পরে এবং নির্বাচনের দিন ভোটারসহ সর্ব সাধারনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
১০। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ নির্বাচন পরিচালনার জন্য আবশ্যকীয় সকল সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন কমিশনের তত্ববধানে ন্যস্ত করা। এবং
১১। নির্বাচনকালীন সরকারের কর্মপরিধি কেবলমাত্র আবশ্যকীয় দৈনন্দিন (রুটিন) কার্যাবলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা।

উপরে বর্নিত বিষয়সমূহ তখনই সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পাদিত হতে পারে যখন প্রতিটি সংস্থা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন করবে।

সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি নির্বাচন প্রত্যাশী সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন (Selection) করার ক্ষেত্রেও নির্বাচনে অংশ গ্রহনকারী রাজনৈতিক দলসমূহের গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল আচরণও খুবই জরুরী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দৃষ্টান্ত অনুসরণ যোগ্য।

- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই সর্বপ্রথম ২০০৮ এর নির্বাচনে তৃনমূলের নেতাকর্মীদের ভোটের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের বাছাই করে পরবর্তীতে নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় নির্বাচনী বোর্ডের মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্ত করে। প্রায় ১০ (দশ) লক্ষ নেতাকর্মী এই প্রক্রিয়ায় সামিল হয়ে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবং বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রার্থী বাছাইয়ের এই ধারা অব্যাহত থাকে। ২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী বাছাইয়ের এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বদ্ধ পরিকর।

নির্বাচন প্রক্রিয়ার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কর্তৃক নিয়োজিত পোলিং এজেন্টদের ভূমিকা। নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে পোলিং এজেন্টদের উপযুক্ত প্রশিক্ষন থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কেন্দ্রের ভোটারদের মধ্য থেকে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করা হলে নির্বাচনে জাল ভোট প্রয়োগের প্রবণতা প্রায় বন্ধ করা সম্ভব। বিভিন্ন সময়ে লক্ষ্য করা গিয়েছে প্রধান দুই/একটি রাজনৈতিক দল ব্যতীত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পোলিং এজেন্টগণ হয় নির্বাচন কেন্দ্রে যান না অথবা নির্বাচন শুরু হওয়ার ২/১ ঘন্টার মধ্যেই নির্বাচন কেন্দ্রের বাইরে এসে মনগড়া বিভিন্ন গুজব ছড়াতে থাকে। এ লক্ষ্যে যদিও নির্বাচন আচরন বিধিমালা প্রণীত হয়েছে, তথাপি সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দল কর্তৃক নিয়োজিত পোলিং এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বাধিক সতর্ক হওয়া আবশ্যক।

সুষ্ঠু, অবাধ ও সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা। এই দুইটি বিষয়কে পরিপূর্ণতা দেওয়ার জন্যই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহন ও বাস্তবায়ন করে চলেছেন, যার সুফল আজকের নির্বাচন কমিশন।

ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণনয়ন, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ই-ভোটিং এর প্রবর্তন, নির্বাচনের অর্থ ও পেশীশক্তির ব্যবহার রোধে নানাবিধ আইন ও বিধি প্রণয়ন, নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা তৈরি, তৃণমূলের ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই, দেয়াল লিখন ও রঙিন পোস্টারের পরিবর্তে সাদা-কালো পোস্টারের প্রবর্তন, নির্বাচন কমিশন সচিবলায় স্থাপন এবং নির্বাচন কমিশনকেই তাদের নিজস্ব জনবল নিয়োগের ক্ষমতা অর্পন, প্রয়োজনীয় আর্থিক তহবিল প্রদান, সাধারন প্রশাসনের উপর নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধান, নির্বাচনী অপরাধ প্রতিরোধে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর নেতৃত্বে পর্যাপ্ত সংখ্যক ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা, এবং যানবাহনের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামগ্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যে দৃশ্যমান উন্নতি সাধিত হয়েছে তার সকল কিছুর মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগ কর্তৃক উপস্থাপিত ২৩ দফা। এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত সাংবিধানিক পদের অধিকারীদের সমন্বয়ে সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইলেকশন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় বর্তমানে সর্বাধিক সক্ষমতা ও দক্ষতার সাথে তাঁদের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হচ্ছে। নির্বাচনে জনমানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিতকল্পে দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

TOP