করোনাকালীন সংকটেও কৃষির সাফল্য

407

Published on মে 22, 2020
  • Details Image

সাজ্জাদুল হাসানঃ

করোনা পরিস্থিতির প্রাদুর্ভাবকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সংঘটিত বৈশ্বিক মহা বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশ এই সংকটকাল অতিক্রম করছে। করোনা ভাইরাসের এই সংকট অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের মতো কৃষি খাতেও বিস্তার লাভ করেছে। করোনা ভাইরাস যেমন রোগের উত্স হিসেবে মৃত্যুর কারণ হতে পারে ঠিক সেভাবেই অভাব, ক্ষুধা, হতাশা মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে। পুরো দেশের অর্থনীতিকে বেসামাল করে তুলতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিকে, বিশেষ করে কৃষি অর্থনীতিকে উজ্জীবিত রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে কৃষি উত্পাদনের ওপর গুরুত্ব আরোপের মাধ্যমে যথাযথ ভূমিকা পালন করা যেতে পারে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামগ্রিক কৃষিকে গতিশীল রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আবাদি জমি ফেলে না রেখে প্রতি ইঞ্চি পতিত জমিতে ফসল ফলানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ব্রিটেনের আর্মির গৌরবগাথা অবদানের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরম সংকট সময়ে ব্রিটেনে নারীরা খাদ্যনিরাপত্তায় এক কালজয়ী অবদান রেখেছিল।

প্রলম্বিত বিশ্বযুদ্ধের নিশ্চিত পরিণতি দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল নারীদের হ্যাট-জিনস পরে ফসলের মাঠে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চার্চিলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশপ্রেমিক প্রায় ৮০ হাজার ল্যান্ড গার্লস হ্যাট-জিনস পরে কাস্তে কোদাল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল ফসলের মাঠে, খামারে, পথে-প্রান্তরে। দেশপ্রেমের সঙ্গে শ্রম ঘাম আর বিশ্বমানবতার আবেগ সেদিন ব্রিটিশ ল্যান্ড গার্লস দুর্ভিক্ষ ও চরম খাদ্যাভাব থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল ৩ কোটি ব্রিটিশ নাগরিককে। ঠিক তেমনি আজকের এই করোনা সংকটকালে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে কৃষকদের পাশে ফসলের মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে কৃষি, প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তারা। বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মীরাও কৃষকের পাশে ধান কাটতে সহায়তা করছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষকদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার কৃষি প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন এই প্রণোদনা থেকে কৃষকরা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে মাঠে ফসল চাষ করতে পারবেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে গাইডলাইন প্রকাশ করেছে। এ ছাড়াও ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সার, সেচ ছাড়াও এই ভর্তুকি খামার যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ব্যবহার করা যাবে। করোনা সংকট পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। বর্তমান ফসল উত্তোলন, ফসলের নমুনা কর্তন, বিদ্যমান ফসলের পরিচর্যা, উত্পাদনের উপকরণ সংগ্রহ ও সরবরাহ, বিতরণ, প্রণোদনা কর্মসূচির তালিকা তৈরি ও বাস্তবায়নসহ জরুরি নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে চলমান ত্রাণ কার্যক্রমেও ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ।

প্রাসঙ্গিকভাবে বলা প্রয়োজন নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার হাওর অঞ্চলে আমার জন্ম। বিগত কয়েক বছর যাবত্ দেখেছি নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এসব এলাকার হাওর অঞ্চলে বোরো ধান কর্তনের জন্য সাধারণত কৃষিশ্রমিক পাবনা, সিরাজগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম রংপুর, গাইবান্ধা, জামালপুর, টাঙ্গাইলসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে আনা হয়। এবার যেহেতু করোনা সংকট চলমান এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচলের বাধানিষেধ রয়েছে, তাই কৃষকের ফসল ঘরে তুলে আনার ক্ষেত্রে ছিল দুশ্চিন্তার কারণ। এমনই এক পরিস্থিতিতে আমাদের এলাকার কৃষকদের দিন রাত ঘুম ছিল না। অনেকেই আমাকে কৃষিশ্রমিক বাইরে থেকে আনার জন্য সহযোগিতা করার অনুরোধ করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেছি। তবে কৃষি অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপগুলি জানার খুব আগ্রহ ছিল। কৃষিসচিব জনাব নাসিরুজ্জামানের কাছ থেকে বিস্তারিত অবগত হয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কৃষি মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলেই আজকে বোরো ধান সংগ্রহে আমরা একটা প্রত্যাশিত ফলাফল পেতে যাচ্ছি।

এ ধরনের উদ্যোগ শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বাস্তবে কৃষকদের মাঠে সেটা প্রয়োগ করতেও দেখা গেছে। সেক্ষেত্রে প্রশাসন, পুলিশ এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একাত্ম হয়ে কাজ করে গেছেন। চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলে ধান কর্তনে কাজ করার জন্য কৃষিশ্রমিকদের কে পাঠিয়েছেন এবং নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার চট্টগ্রাম থেকে প্রেরিত কৃষিশ্রমিকদের সঠিক জায়গায় প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, হঠাত্ জানতে পারলাম, মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি সম্ভবত একুশে এপ্রিল নেত্রকোনা জেলার মদন ও খালিয়াজুরী উপজেলায় কৃষকদের ধান কর্তন দেখার জন্য সকাল ৭টায় ঢাকা থেকে রওনা হবেন। মাননীয় মন্ত্রীকে তখন ফোন করে বিষয়টা নিশ্চিত হলাম এবং করোনার ঝুঁকির মধ্যে সাবধানে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন কৃষকরা যেহেতু ঝুঁকিতে কাজ করছে তাদেরকে উত্সাহিত করার জন্য যাওয়া দরকার। যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তিনি সরাসরি হাওর অঞ্চলে কৃষকদের উত্সাহিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তাই সকলের প্রচেষ্টায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বোরো ধান উত্পাদন সংগ্রহের ক্ষেত্রে আজ আমরা সফলতার দ্বারপ্রান্তে।

আশা করা যাচ্ছে উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ৪ লক্ষ টন নির্ধারণ করা হলেও তা ছাড়িয়ে যাবে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। আমার কাছে মনে হয়েছে আমরা শুধু সমালোচনার দিকটাই তুলে ধরি, তবে ভালো কাজের প্রশংসা করা উচিত। এই যে বিশাল একটি কাজ সম্পন্ন হয়েছে তার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মী, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীগণসহ প্রশাসন, পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি যারা অবদান রেখেছেন তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তবে আমাদের এই সবকিছু অর্জনের মূল চালিকাশক্তি কৃষিবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনাকালীন এই সংকটে ভিডিও কনফারেন্সে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সর্বদাই বলতে শুনেছি, কৃষিক্ষেত্রে এক ইঞ্চি জমিও পতিত রাখা যাবে না উত্পাদন বাড়াতে হবে। আমাদের এই নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। এটা ভুলে গেলে চলবে না পৃথিবীতে যত মহামারি হয়েছে এবং তাতে যত লোক মারা গেছে তার চেয়ে বেশি লোক মারা গেছে মহামারি উত্তর দুর্ভিক্ষে। ২০১৯-২০২০ এর করোনা মহামারিতে সারা পৃথিবীতে কী ঘটবে তা এখনই বলা মুশকিল। তবে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ভবিষ্যদ্বাণী করেছে করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বে ৩ কোটি মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান কবীরের কাছ থেকে জানতে পেরেছি এবার আউশের আবাদ গত বছরের চেয়ে প্রায় ৩ লক্ষ হেক্টর বৃদ্ধি করা হয়েছে। আউশের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মে মাসের মধ্যেই রোপণ কাজ শেষ হবে। আমরা আশা করতে পারি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আউশের উত্পাদন গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি হবে এবং লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে গত বছর ১১ লাখ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ করা হয়েছিল এবং ধান উত্পাদন হয়েছিল ৩০ লাখ টন। এ বছর ১৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ করা হবে এবং উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করা হয়েছে ৩৭ লাখ মেট্রিক টন। আমন ধানের চাষাবাদ এবং উত্পাদনের ক্ষেত্রে ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলে আশাবাদী। তবে খাদ্য উত্পাদনের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে খাদ্য বিপণন ব্যবস্থারও উত্কর্ষ সাধন করতে হবে। তবে একথাও ঠিক, আমাদের কৃষি যন্ত্রায়নের দিকে আরো আগানোর প্রয়োজন রয়েছে। জমিতে সার দেওয়া, পানি দেওয়ার কাজগুলো যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। এখনো আমাদের কৃষিতে ব্যবহারের যন্ত্র প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হলেও সেদিকে আমরা আগাচ্ছি।

জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ চাল উত্পাদনে উদ্বৃত্ত। আরো খুশির খবর, চাল উত্পাদনে আজ বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে সারা বিশ্বে তৃতীয় স্থান অধিকার করতে যাচ্ছে। তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কৃষির অগ্রগতিতে আমরা আরো অনেক দূর এগিয়ে যাব আশা রাখি।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি, চেয়ারম্যান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সাবেক সিনিয়র সচিব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

সৌজন্যেঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত