পিতা ও বন্ধু

2202

Published on মার্চ 17, 2019
  • Details Image

আব্দুল গাফফার চৌধুরীঃ

১৭ মার্চ একজন ব্যক্তির জন্মদিবস নয়, একটি জাতির জন্মদিবস। কথাটা অত্যুক্তি নয়। ভারতে তো বহু ক্ষণজন্মা রাজনৈতিক নেতা জন্মেছেন, যারা ভারতের স্বাধীনতাকে এগিয়ে এনেছেন; কিন্তু মহাত্মা গান্ধী তাকে পূর্ণতা দিয়েছেন। তাই তিনি জাতির পিতা। তার জন্মদিনকে বলা হয় “নতুন ভারতের জন্মদিবস”। তবু গান্ধীর নামের সঙ্গে ভারতের নাম অভিন্ন নয়; কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ নামটি অভিন্ন। বাংলাদেশ বলতেইবহির্বিশ্ব বোঝে বঙ্গবন্ধুকে। কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, “আমি হিমালয় পাহাড় দেখিনি, শেখ মুজিবকে দেখেছি।” বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু সংবাদ শুনে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো বলেছিলেন, “হিমালয়ের পতন হলো।” হিমালয় পর্বতের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি অঙ্গাঙ্গী জড়িত হয়ে গেছে।

এই বঙ্গবন্ধুর ৯৯তম জন্মদিন আজ (১৭ মার্চ ২০১৯)। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও এই দিবসটি স্মরণে ও শ্রদ্ধায় মণ্ডিত হয়ে পালিত হচ্ছে। আগামী বছর ২০২০ সালে হবে তার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন। বাংলাদেশে সরকারিভাবে এই জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের চলছে মহা আয়োজন। বিদেশের সর্বত্র চলছে সেই একই আয়োজন। তার অংশ হিসেবে বর্তমান বছরের মার্চ মাস থেকেই দেশে-বিদেশে শুরু হয়ে গেছে এই উত্সবের মহড়া।

গত বুধবার (১৩ মার্চ) লন্ডনের ইস্টএন্ডে ওসমানি সেন্টারে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে হলো এক মনোজ্ঞ সরোদ বাজনার অনুষ্ঠান। লন্ডনের বাংলাদেশ দূতাবাস এটির আয়োজন করে। সন্ধ্যে সাতটা থেকে রাত সাড়ে নটা পর্যন্ত বাংলাদেশের বিখ্যাত সরোদ শিল্পী রাজরূপা চৌধুরী একটানা সরোদ বাজান। হলভর্তি শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে এই সরোদ বাদন।

এর আগে কমনওয়েলথের এক অনুষ্ঠানে প্রিন্স চার্লস-এর উপস্থিতিতে রাজরূপা চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে তার বাজনা নিবেদনের ঘোষণা দিয়ে যখন সরোদে হাত দেন, তখন স্বয়ং প্রিন্স চার্লসও তার প্রশংসা করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, প্রিন্স চার্লস এখন কমনওয়েলথের প্রধান। আমি কমনওয়েলথ সমিতি কর্তৃক আয়োজিত সরোদ বাজনার এই অনুষ্ঠানে ছিলাম না। এই অনুষ্ঠানের খবর পেয়েছি লন্ডনে আমাদের দূতাবাসে নবনিযুক্ত প্রেস মিনিস্টার আশিকুন্নবীর কাছে। আর লন্ডনের কোনো কোনো কাগজে দেখেছি সরোদ শিল্পী রাজরূপা চৌধুরীর প্রশংসা। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে তাকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের এই অভিনব আয়োজন জন্মদিনটিকে আরো উজ্জ্বল ও ভাবগম্ভীর করেছে।

রাজরূপা চৌধুরীর সরোদ বাজনা শুনতে শুনতে আমার মন চলে গিয়েছিল সুদূর অতীতে। পঞ্চাশের দশকে সম্ভবত গোড়ার দিকে সরোদের জনক ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ দিল্লি থেকে ঢাকা সফরে এসেছিলেন। তাকে নিয়ে তখন মহা হইচই। কার্জন হলে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেই সভায় তিনি সরোদ বাজিয়েছিলেন। আমার জীবনের পরম সৌভাগ্য। এই সংগীতাচার্যের নাগরিক সংবর্ধনা সভায় যে মানপত্র পাঠ করা হয় সেটি লেখার দায়িত্ব পড়েছিল আমার উপর। ড. আনিসুজ্জামানের হাতের লেখা মুক্তোর মতো। তার হাতে লেখা মানপত্রটি সংবর্ধনা সভায় পঠিত হয়েছিল।

ঢাকার কার্জন হলে সেদিন তিলধারণের স্থান ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি, আমি সরোদ বাজনা শুনতে সেদিন কার্জন হলে যাইনি, গিয়েছিলাম ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁকে দেখতে। সেই সঙ্গে তার তবলা-শিল্পী আল্লারাখাকেও দেখতে। হঠাত্ দেখি ঋষিতুল্য চেহারার ওস্তাদ আলাউদ্দীন, মুখে সাদা দাড়ি, মাথায় কিশতি টুপি, বঙ্গবন্ধুর কাঁধে হাত রেখে মঞ্চে উঠছেন, তার পেছনে ঢাকা বেতারের তখনকার বিখ্যাত উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পী ভূরি বেগম।

সরোদ বাদনের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে (তখনো বঙ্গবন্ধু হননি) দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু শ্রোতাদের আসনে সামনের সারিতে বসতেই আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, মুজিব ভাই, আপনিও এই অনুষ্ঠানে এসেছেন! বঙ্গবন্ধু ঠোঁট থেকে পাইপটা সরিয়ে বললেন, কেন তোমার কী ধারণা, রাজনীতি করি বলে সংগীতের প্রতি টান নেই? আমি অপ্রস্তুত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছিলাম।

পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জেনেছি। বঙ্গবন্ধু তার কৈশোরে ছিলেন ভালো ফুটবল খেলোয়াড়। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজের (বর্তমানে মওলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজ) ছাত্র থাকাকালে বেকার হোস্টেলে গান এবং আবৃত্তির আসর বসাতেন। তার বড় ছেলে শেখ কামাল একদিকে ক্রীড়াবিদ, অন্যদিকে সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। আবাহনী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রীজীবনে একদিকে রাজনীতি করতেন, অন্যদিকে ছায়ানটের ছাত্রী ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর এতোই ভক্ত ছিলেন যে, ময়মনসিংয়ের মুক্তাগাছায় একাধিকবার গেছেন তার সাধনপীঠ দেখার জন্য। নেহেরু ও মুজিব চরিত্রের মধ্যে গান-বাজনার ব্যাপারে একটা মিল এখানে যে নেহেরুও আলাউদ্দীন খাঁর সরোদ বাজনা খুব ভালোবাসতেন এবং তাকে ভারতের নাগরিকত্ব দিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ খেতাব দিয়েছিলেন। আলাউদ্দীন খাঁ ছিলেন বিশ্ববিশ্রুত সরোদ শিল্পী। একবার প্যারিসে তার সরোদ বাদন অনুষ্ঠানের পর লন্ডনের ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকা মন্তব্য করেছিলো, "He looks like an ordinary man, but when he plays he looks like a god.'' (তাকে দেখতে সাধারণ মানুষের মতো। কিন্তু তিনি যখন বাজান, তখন তাকে একজন দেবতার মতো দেখায়।)

বঙ্গবন্ধু ছিলেন গায়ক, শিল্পী সাহিত্যিকদের অসীম অনুরাগী। দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রুগ্ণ কবি নজরুলকে তার পরিবারের অনেক সদস্যসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় এনে তার বসবাস ও চিকিত্সার মর্যাদাজনক ব্যবস্থা করেছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন দূরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হলে তাকে লন্ডনে পাঠিয়ে চিকিত্সার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমিও তখন লন্ডনে। ব্রিটেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রথম হাই কমিশনার সৈয়দ আবদুস সুলতান আমাকে বলেছেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের চিকিত্সায় যাতে কোনোপ্রকার ত্রুটি না হয় সেজন্যে বঙ্গবন্ধু তাকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সপ্তাহে অন্তত দু’বার তার স্বাস্থ্যের খবর নিতেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাও তার পিতার এই গুণটি পেয়েছেন এবং শিল্পী সাহিত্যিকদের আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য-সহযোগিতা দিতে ক্ষণমাত্র দ্বিধা করেন না। পিতার মতোই তিনি এই ব্যাপারে দলমতের বিচার করেন না। সদ্যপ্রয়াত চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেনের চিকিত্সায় বিরাট অর্থ বরাদ্দ তার প্রমাণ। বিএনপি’র সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুলকেও তিনি অসুস্থতার চিকিত্সায় সহযোগিতা দানের অফার দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু চরিত্রেরও বৈশিষ্ট্য ছিল তার রাজনৈতিক বৈরীদেরও বিপদে-আপদে সাহায্য দিতে এগিয়ে যাওয়া। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মওলানা ভাসানী যখন তখনকার চীনপন্থী কমিউনিস্টদের এবং কাজী জাফর-জাদুমিয়াদের খপ্পরে পড়ে মুজিব সরকারের বিরোধিতা করছেন, তখনো কাদের সিদ্দিকীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু প্রতি মাসে মওলানা ভাসানীকে অর্থ সাহায্য পাঠাতেন। লুঙ্গি-গামছাও পাঠাতেন। ’৭১-এর কোলাবরেটর শাহ্ আজিজুর রহমান যখন কারাবন্দি, তখন তার অসহায় পরিবারকে মাসে দু’হাজার টাকা আমিনুল হক বাদশার মাধ্যমে দিতেন।

এই মানুষটি একাধারে জাতির পিতা এবং বন্ধুও। জাতি তাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাম দিয়েছে বঙ্গবন্ধু। অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকদের হাতে লুপ্ত হওয়া বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি এই দু’টি নামের পুনরুদ্ধার এবং বাঙালির ন্যাশন-স্টেট প্রতিষ্ঠা দ্বারা তিনি হয়েছেন জাতির পিতা। অনেকটা ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকর্ণের মতো। তিনি একদিকে জাতির পিতা, অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার মানুষের কাছে বাংকার্নে বা ভাই কার্নো। তুরস্কে জাতির পিতা কথাটি নব্যতুরস্কের প্রতিষ্ঠাতার নামের সঙ্গেই স্থায়ীভাবে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কামাল পাশার নাম এখন কামাল আতাতুর্ক। আতাতুর্ক কথাটির অর্থ তুরস্কের পিতা। বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর নামের সঙ্গে দু’টি কথাই যোগ করেছে, “জাতির পিতা এবং বঙ্গবন্ধু।” ইউরোপের সংবাদপত্রে শেখ মুজিব নামটি লেখা হলেই তার সঙ্গে যুক্ত করা হয় “ফাউন্ডিং ফাদার অব বাংলাদেশ।”

তার এই বিশ্বস্বীকৃত পরিচয় এমনকি তার নামটিও এক সময় মানুষের মন থেকে, ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে দেশি স্বৈরাচারী শাসকের দল। তারা চেয়েছিল দেশটাকে আবার ঔপনিবেশিক যুগে ফিরিয়ে নিতে। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় রাষ্ট্রকাঠামোর অন্ধকার গুহায় বন্দি করতে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ এবং তার জন্মদিন মৃত্যুদিবস পালন করাও ছিল বিপজ্জনক। বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যা দিবসকে করা হয়েছিল এক মহিলার বানোয়াট জন্মদিন পালনের উত্সবের দিন। কিন্তু ইতিহাস এই নির্লজ্জ মিথ্যাকে গ্রহণ করেনি, ধারণ করেনি। তারা আজ মানুষের আদালতে এবং ইতিহাসের আদালতেও দ্লিত এবং বিস্মৃত প্রায়। আর বঙ্গবন্ধু তার নাম ও সংগ্রামের বিভায় দীপ্ত হয়ে আবার অমর ইতিহাস পুরুষ হিসেবে জেগে উঠেছেন। তার বিয়োগ দিবসে মানুষ কাঁদছে। তার জন্মদিনে মানুষ হাসছে, উত্সবে মেতে উঠছে।

আগামী বছর ২০২০ সালে, শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বজুড়েই বঙ্গবন্ধুর জন্মশততমবার্ষিকী উদযাপিত হবে। তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বর্তমান বছর (২০১৯) থেকেই। জন্মদিবসে তাকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে পড়ছে ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ তার জন্মদিন পালনের কথা। সারা শহর প্রায় জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। শহরের মানুষ ছুটছিল ফুল হাতে পুরনো গণভবনের দিকে।

এখন ঢাকা শহরে ফুলের দোকানের অন্ত নেই। মানুষ ফুল কেনে এবং দেশে ব্যাপকভাবে ফুলের চাষ হয়। কিন্তু তখন একটি ফুলের দোকান ছিল না। ফুল পেতে হলে কারো শখের বাগানের ফুল অনেক মিনতি করে নিতে হতো অথবা ভাগ্য প্রশস্ত হলে কখনো কদাচিত্ রাস্তায় দাঁড়ানো ফুলবিক্রেতা বালকদের কাছ থেকে ফুল কিনতে হতো। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ঢাকা শহরে কোথাও একটি ফুল নেই। মানুষ সব কিনে নিয়ে গণভবনের দিকে ছুটছে। সকল শ্রেণির সকল পেশার মানুষ।

তখন কার্জন হলের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচারের একটি গার্ডেন ছিল। একমাত্র সেখানেই তখন ফুল পাওয়া যেতো। সেদিন সেখানে গিয়েও ফুল পেলাম না। তখন কলকাতা থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমার একটা বই হাতে নিয়ে গণভবনমুখী জনস্রোতে মিশে গেলাম। গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধু গণভবনের সিঁড়ি বারান্দায় দাঁড়ানো। তার কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। চারদিকে শুধু মানুষের মাথা। বঙ্গবন্ধুর মাথার চুলে, সারা গায়ে শুধু মানুষের দেওয়া ফুল আর ফুল। বঙ্গবন্ধু হাসছেন।

সন্দেহ নেই আজ ঢাকা শহর আরো উৎসবমুখর। উত্সবমুখর টুঙ্গিপাড়াও, ফুলে ফুলে ভরে গেছে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন, যা এখন মিউজিয়াম, সম্ভবত টুঙ্গিপাড়ায় তার সমাধিতেও আজ শুধু মানুষ আর ফুলের ঢল। কিন্তু লন্ডনে বসেও আজ তার জন্মদিনে আমার চোখে ভাসছে ১৯৭২ সালে দেখা বঙ্গবন্ধুর হাস্যোজ্জ্বল মুখ, যা আর কোনোদিন দেখাবো না।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত